__ ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
একটি রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ কেন্দ্রবিন্দুতে যখন চুরির মতো অপরাধ ঘটে, তখন তা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং তা সমাজের গভীরে শিকড় গেড়ে বসা পচনশীল অবস্থার চরম বহিঃপ্রকাশ। সম্প্রতি ‘প্রাইম মিনিস্টারের লাল টেলিফোনের তার চুরি’র মতো ঘটনাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, নিরাপত্তার বলয় কতটা নড়বড়ে এবং নৈতিকতার মানদণ্ড কোন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এটি কোনো সাধারণ চুরি নয়, বরং রাষ্ট্রীয় আভিজাত্য, শৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তার প্রতি এক চরম অবমাননা। এই ঘটনাটি আমাদের অসুস্থ সমাজের এক অমোঘ দর্পণ, যা আমাদের অস্তিত্বের সংকটকে আরও প্রকট করে তুলেছে।
সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র: একটি বিশ্লেষণ সামাজিক অবক্ষয় কোনো একদিনে তৈরি হয় না। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, জবাবদিহিতার অভাব এবং নৈতিক শিক্ষার অনুপস্থিতি একটি সমাজকে ক্রমান্বয়ে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।
এই পরিস্থিতির কয়েকটি মূল দিক নিচে তুলে ধরা হলো:
নৈতিকতার স্খলন: বস্তুগত অর্জনের নেশায় মানুষ আজ নীতি-নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়েছে। সততা ও নিষ্ঠার চেয়ে অর্থ ও ক্ষমতার আধিপত্য বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। আইনের শাসনের অভাব: অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি অপরাধ প্রবণতাকে উৎসাহিত করে। লাল টেলিফোনের তার চুরির মতো দুঃসাহসিক কাজ তখনই সম্ভব হয়, যখন অপরাধী জানে যে তার কোনো বিচার হবে না। সামাজিক দায়বদ্ধতার অভাব: প্রতিবেশী বা সহনাগরিকের প্রতি দায়িত্ববোধ কমে যাওয়া এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানসিকতা সমাজকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। শিক্ষাব্যবস্থায় চারিত্রিক শিক্ষার অভাব: আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত ডিগ্রি সর্বস্ব হয়ে পড়েছে, যেখানে মানবিক মূল্যবোধ এবং নাগরিক দায়িত্বের চেয়ে প্রতিযোগিতার দৌড়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই অসুস্থ সমাজকে বাঁচাতে আমাদের করণীয় সমাজকে এই গভীর সংকট থেকে উদ্ধার করতে হলে আমাদের কাঠামোগত এবং ব্যক্তিগত—উভয় স্তরেই পরিবর্তন আনতে হবে:
১. জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা: রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধ যে-ই করুক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়—এই দর্শনকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে। ২. শিক্ষা ও মূল্যবোধের পুনর্গঠন: পরিবারের ভেতর থেকেই নৈতিক শিক্ষার সূচনা করতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে মানবিক গুণাবলি ও দেশপ্রেমের পাঠ বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ৩. সামাজিক আন্দোলনের সূচনা: অপরাধ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষক ও সমাজচিন্তকদের সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে যেন তরুণ প্রজন্ম আদর্শের পথে অনুপ্রাণিত হয়। ৪. আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংস্কার: আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। তাদের পেশাদারিত্ব ও সততা বৃদ্ধি করা জরুরি, যাতে তারা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে।
উপসংহার ‘প্রাইম মিনিস্টারের লাল টেলিফোনের তার চুরি’ একটি প্রতীকী সংকেত—এটি আমাদের অস্থির ও অসুস্থ সময়ের এক আর্তনাদ। রাষ্ট্র যদি তার সর্বোচ্চ সুরক্ষাবলয় রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার প্রত্যাশা কেবল বিলাসিতা হয়ে দাঁড়ায়। তবে এই অন্ধকার থেকে উত্তরণের পথটি আমাদেরই তৈরি করতে হবে। সম্মিলিত নৈতিক জাগরণ, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং প্রতিটি নাগরিকের দেশাত্মবোধই পারে এই অসুস্থ সমাজকে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতে। মনে রাখতে হবে, সমাজ যখন অসুস্থ হয়, তখন তার দায়ভার আমাদের প্রত্যেকের কাঁধেই বর্তায়; তাই প্রতিকারও শুরু করতে হবে আমাদের নিজেদের জায়গা থেকেই।#
... লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক প্রাবন্ধিক ও সমাজচিন্তক।#
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: রোকনুজ্জামান রোকন নির্বাহী সম্পাদক: ইফতেখার আলম সম্পাদক কর্তৃক উত্তর নওদাপাড়া, পো: সপুরা, রাজশাহী-৬২০৩ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল: ০১৭১১-২০৮ ১৭২, ০১৮৩৪-৮৬১ ০০৭ ইমেইল: dainiksobujnagar@gmail.com
Copyright © 2025 দৈনিক সবুজ নগর