___ ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: ইসলামি স্থাপত্যশৈলী ও মসজিদ ব্যবস্থাপনায় 'মেহরাব' (Crescent/Niche) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পরিচিত অংশ। সাধারণত মেহরাব বলতে মসজিদের সামনের দেওয়ালের মধ্যবর্তী সেই অর্ধবৃত্তাকার বা অবতল অংশকে বোঝায়, যা কিবলার দিক নির্দেশ করে এবং যেখানে দাঁড়িয়ে ইমাম সাহেব নামাজ পরিচালনা করেন। তবে প্রাচীন আমলের অনেক মসজিদে বা আধুনিক যুগের সীমিত জায়গার ওপর নির্মিত রেডিমেড ও ছোট আকৃতির মসজিদে মেহরাবের আকার বেশ ছোট ও সংকীর্ণ হয়ে থাকে। মেহরাব ছোট হওয়ার কারণে অনেক সময় ইমামের পক্ষে ভেতরে দাঁড়ানো কষ্টকর হয় কিংবা জামাতের কাতার বিন্যাসে নানাবিধ সমস্যার সৃষ্টি হয়। এমতাবস্থায় ইমাম যদি মেহরাবের বাইরে প্রথম কাতারের মাঝখানে বা মেহরাবের একদম মুখে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ান, তবে নামাজ শুদ্ধ হবে কি না—তা নিয়ে সাধারণ মুসল্লিদের মাঝে প্রায়শই সংশয় দেখা দেয়। ইসলামি ফিকহ ও শরিয়তের সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্তের আলোকে এই বিষয়ের চুলচেরা বিশ্লেষণ বর্তমান সময়ে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
মেহরাব ব্যবহারের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও মূল উদ্দেশ্য শরিয়তের মূল তথ্য ও উপাত্ত পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র যুগে কিংবা খোলাফায়ে রাশেদিনের আমলে বর্তমান যুগের মতো দেয়াল খোদাই করা বা অবতল আকৃতির মেহরাবের কোনো অস্তিত্ব ছিল না।
ঐতিহাসিক উপাত্ত: ইতিহাসবিদ ও ফকিহগণের মতে, ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিকের শাসনামলে (৮৮ হিজরি/৭০৭ খ্রিষ্টাব্দে) মদিনার গভর্নর ওমর বিন আবদুল আজিজ (রহ.) মসজিদে নববীর পুনর্নির্মাণের সময় আনুষ্ঠানিকভাবে এই অবতল মেহরাব সংযোজন করেন।
[^১] মূল উদ্দেশ্য: মেহরাব তৈরির মূল উদ্দেশ্য দুটি—প্রথমত, দূর থেকে বা দূরবর্তী কাতার থেকে কিবলার দিক সঠিকভাবে নির্ণয় করা। দ্বিতীয়ত, ইমামের দাঁড়ানোর স্থান নির্দিষ্ট করার মাধ্যমে জামাতের কাতার যেন দুই পাশে সমানভাবে বিন্যস্ত হতে পারে (অর্থাৎ ইমাম যেন মাঝখানে থাকেন) তা নিশ্চিত করা।[^২] সুতরাং, মেহরাব স্বয়ংসম্পূর্ণ কোনো ইবাদত বা নামাজের মৌলিক রুকন (ফরয-ওয়াজিব) নয়; বরং এটি জামাতকে সুশৃঙ্খল করার একটি স্থাপত্যিক মাধ্যম মাত্র। ফিকহি উপাত্ত ও মাসয়ালা বিশ্লেষণ ইসলামি ফিকহের প্রসিদ্ধ ग्रंथাবলি এবং চার মাজহাবের ইমামগণের ঐকমত্যের ভিত্তিতে ছোট মেহরাবের ক্ষেত্রে ইমামের দাঁড়ানোর অবস্থানকে তিনটি প্রধান তথ্যের আলোকে বিশ্লেষণ করা যায়:
১. নামাজের শুদ্ধতা (সহীহ হওয়া) নামাজ শুদ্ধ হওয়ার জন্য ইমামের শরীর বা সেজদার স্থান মেহরাবের ভেতরে থাকা কোনো শর্ত নয়। ইমাম যদি মেহরাবের বাইরে সাধারণ মেঝেতে বা প্রথম কাতারের ঠিক মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে ইমামতি করেন, তবে নামাজ নিখুঁতভাবে সহীহ ও শুদ্ধ হয়ে যাবে। নামাজের কোনো ফরয, ওয়াজিব বা সুন্নতে মুয়াক্কাদা এতে লঙ্গিত হয় না।[^৩] ২. অপছন্দনীয়তা বা মাকরূহের অপনোদন সাধারণ অবস্থায় কোনো ওজর (কারণ) ছাড়া ইমাম যদি মেহরাব পুরোপুরি পরিহার করে মুক্তাদিদের সাথে একই কাতারে সম্পূর্ণ মিশে দাঁড়ান, তবে কোনো কোনো ফকিহ একে 'মাকরূহে তানজিহি' (সামান্য অপছন্দনীয়) বলেছেন—কারণ এতে ইমাম ও মুক্তাদির মাঝে চাক্ষুষ পার্থক্য স্পষ্ট থাকে না। কিন্তু যদি মসজিদ ছোট হয়, মেহরাব সংকীর্ণ হয় বা ইমামের দাঁড়াতে কষ্ট হয়, তবে এই মাকরূহের বিধানটি সম্পূর্ণ উঠে যায়।[^৪] ইসলামি শরিয়তের একটি বিখ্যাত উসুল বা মূলনীতি হলো: "প্রয়োজন ও সংকীর্ণতা অপছন্দনীয় বিষয়কে বৈধ বা সাধারণ করে দেয়।"[^৫] সুতরাং, ছোট মসজিদের ক্ষেত্রে কাতারের মাঝখানে বা মেহরাবের বাইরে দাঁড়ানো বিন্দুমাত্র মাকরূহ হবে না।
৩. উত্তম ও ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি যদি মেহরাব ছোট হয়, তবে ফকিহগণ অত্যন্ত সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ একটি সমাধানের কথা বলেছেন। ইমাম সাহেব এমনভাবে দাঁড়াবেন যেন তাঁর দুই পা মেহরাবের বাইরে (প্রথম কাতারের সমান্তরালে বা সামান্য সামনে) থাকে, কিন্তু তিনি যখন রুকু ও সেজদা করবেন, তখন তাঁর মাথা ও সেজদার স্থান যেন মেহরাবের ভেতরের অংশে পড়ে।
[^৬] সুবিধা: এই পদ্ধতিতে নামাজ পড়ালে মেহরাব ব্যবহারের সুন্নত ও ঐতিহ্য রক্ষা হয়, আবার সংকীর্ণতার কারণে ইমামের যে শারীরিক কষ্ট হতো, তাও দূর হয়। একই সাথে প্রথম কাতারের মুসল্লিদের জন্য জায়গা সংকুচিত হয় না। উপসংহার পরিশেষে বলা যায়, ইসলাম একটি সহজ ও বাস্তবসম্মত জীবনব্যবস্থা। মসজিদের মেহরাব ছোট বা সংকীর্ণ হওয়া কোনো কাঠামোগত ত্রুটি হতে পারে, কিন্তু এটি ইবাদতের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়। শরিয়তের অকাট্য তথ্য ও ফিকহি উপাত্ত এটাই প্রমাণ করে যে, ছোট মসজিদে মেহরাবের ভেতরে জায়গা না হলে ইমাম সাহেব মেহরাবের বাইরে কাতারের মাঝখানে বা মেহরাবের মুখে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ালে নামাজ পূর্ণাঙ্গরূপে কবুল ও সহীহ হবে। এ নিয়ে মুসল্লিদের মাঝে কোনো প্রকার কুতর্ক, বিভ্রান্তি বা সংশয় সৃষ্টির সুযোগ নেই। বরং স্থান সংকুলান না হলে ইমামের জন্য বাইরে দাঁড়ানোই উত্তম, যাতে নামাজের একাগ্রতা ও প্রশান্তি বজায় থাকে!...
তথ্যসূত্র ও পাদটীকা (Footnotes) [^১]: বিস্তারিত ইতিহাসের জন্য দ্রষ্টব্য: ইবনে কুতাইবা, আল-ইমামা ওয়াস-সিয়াসা; এবং ইমাম সুয়ূতি, হুসনে মুহাদারা ফী আখবারি মিসরা ওয়াল কাহিরা। [^২]: "মেহরাব মূলত ইমামের দাঁড়ানোর দিক এবং জামাতের মধ্যভাগ নির্ণয়ের চিহ্ন"— ইমাম কাসানি, বাদায়েউস সানায়ে ফী তারতীবিশ শারায়ে, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-১৫৯। [^৩]: আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া (ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী), খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-৮৭। [^৪]: আল্লামা ইবনে আবিদিন শামি, রাদ্দুল মুহতার আলাদদুররিল মুখতার (ফাতাওয়া শামি), সালাত অধ্যায়, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-৩১৮ (দারুল ফিকর সংস্করণ)। [^৫]: "المشقة تجلب التيسير" (সংকীর্ণতা সহজীকরণকে টেনে আনে)। দ্রষ্টব্য: ইমাম সুয়ূতি, আল-আশবাহ ওয়ান নাজাইর, পৃষ্ঠা-৭৬। [^৬]: আল্লামা মারগিনানি, আল-হিদায়া, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-১২৩; এবং ফাতাওয়া তাতারখানিয়া, খণ্ড-২, পৃষ্ঠা-২১১।#
লেখক একজন শিক্ষক কবি সাহিত্যিক গবেষক ও প্রাবন্ধিক এবং সমাজচিন্তক।#
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: রোকনুজ্জামান রোকন নির্বাহী সম্পাদক: ইফতেখার আলম সম্পাদক কর্তৃক উত্তর নওদাপাড়া, পো: সপুরা, রাজশাহী-৬২০৩ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল: ০১৭১১-২০৮ ১৭২, ০১৮৩৪-৮৬১ ০০৭ ইমেইল: dainiksobujnagar@gmail.com
Copyright © 2025 দৈনিক সবুজ নগর