প্রিন্ট এর তারিখঃ জুন ৬, ২০২৬, ৮:৩১ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ জুন ৬, ২০২৬, ১১:৫৯ এ.এম

মোহাঃ সফিকুল ইসলামশিবগঞ্জ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) সংবাদদাতা: চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট ইউনিয়নের মোহনবাগ এলাকায় ১৫ বছর বয়সী গৃহপরিচারিকা নয়নীর রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড? এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় ও স্বজনদের অভিযোগ, এটি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়; বরং একটি হত্যাকাণ্ডকে আত্মহত্যা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে বলে তারা দাবি করছেন।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ছোট বয়সেই নয়নীকে আলহাজ রইসউদ্দিন-এর বাড়িতে আনা হয়। পরবর্তীতে তাকে জ্যোতির বাড়িতে গৃহপরিচারিকা হিসেবে রাখা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সেখানে জ্যোতির স্বামী মোঃ মুঞ্জুর-এ-খোদা সুমন কর্মসূত্রে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে অবস্থান করতেন। আর এখানেই যাতায়াত ছিল জ্যোতির বড় বোন মুনমুনের ছেলে মেহবুব-এ-খোদা নোমান-এর। নয়নীকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ধর্ষণ এবং পরে গর্ভবতী করা হয় বলে তার পরিবার দাবি করেছে। এরপর গর্ভপাত করাতে চাপ দেওয়া হয় এবং পরে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

ক্যাপশন: এ বাড়িতে নয়নী গৃহপরিচারিকা হিসেবে কর্মরত ছিল।
পরিবারের দাবি অনুযায়ী, ১ জুন দুপুরের পর রইসউদ্দিনের বাড়ির দোতলায় নয়নীর ওপর নির্যাতন চালানো হয় এবং পরে তাকে হত্যা করে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে আত্মহত্যা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
পুলিশ ও এলাকাবাসীর দাবী, নয়নীকে দিনের বেলা হত্যা করা হলেও সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত হলেও থানাকে ঘটনা জানতে দেওয়া হয়নি।
নয়নীর মৃত্যুর বিষয়ে রইসউদ্দিন-এর সাথে রাত প্রায় সাড়ে ১১টার দিকে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, “সে খুব রাগী ছিল। নয়নীকে আমার স্ত্রী দুপুরে বারবার খাওয়ার কথা বললে সে রাগ করে। পরে সে নিজে নিজে ফাঁসি দিয়েছে।”
মৃত্যুর সংবাদ পুলিশকে জানিয়েছেন কি? প্রশ্নের জবাবে বলেন, “এখনো জানায়নি। তার পরিবারকে খবর দিয়েছি। তারা এসেছে, তাদের সাথে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেব।”
পরে শিবগঞ্জ থানা পুলিশের টিম সেখানে উপস্থিত হয়ে লাশ উদ্ধার করে এবং বাড়ির মালিক রইসউদ্দিনের পরিবারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাযতে নিয়ে যায়। পরদিন লাশ ময়না তদন্তের জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মেডিকেলের মর্গে পাঠানো হয়। ময়না তদন্তের পর নয়ানীর লাশ তার আত্মীয় স্বজদের নিকট হস্তান্তর করে দাফনের জন্য। নয়ানীর পৈতৃক নিবাস শিবগঞ্জ উপজেলার দূর্লভপুর ইউনিয়নের হেরাসনগর ঘোনটোলা গ্রামে দাফন কার্য সম্পন্ন করা হয়।
ক্যাপশন: বাড়ির মালিক রইসউদ্দিন।
এদিকে নয়নীর লাশ গোসল করানো ব্যক্তি ও স্বজনরা লাশ গোসলের সময় নয়নীর শরীরে নির্যানত ও এসিডে ঝলসানোর দাগ দেখতে পান।
গোসলদানকারী আকলিমা বেগম বলেন, “নয়নীর লাশ আমি নিজে গোসল করিয়েছি। লাশ প্যাকেট থেকে বের করার সময় মৃতদেহের লজ্জাস্থান ও এর আশেপাশে এসিডে ঝলসানো দাগ দেখেছি। গোসলের সময় আমরা স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছি যে নয়নী আড়াই থেকে তিন মাসের গর্ভবতী ছিল। তার থুতনীতে আঘাতের দাগ ছিল।”
“আমার বিশ্বাস, নয়নীকে পূর্বে ধর্ষণের ফলে গর্ভবতী হওয়ায় গর্ভপাত ঘটানোর চেষ্টা করা হয়। ব্যর্থ হয়ে তাকে হত্যা করে ঘটনা ধামাচাপা দিতে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি এটি হত্যাকাণ্ড। আমরা এই হত্যার বিচার চাই।”
রুবি বেগম ও বেদানা বেগম নামের গোসলদানকারীদেরর বক্তব্যও একই রকম। তারা জানান,, তার শরীর এসিড দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গোসল দিয়ে বাইরে এসে সবাইকে বলেছি যে, তাকে মেরে ফেলে ফাঁসির নাটক সাজিয়েছে। তার পেটে বাচ্চাও আছে।" এটি আত্মহত্যা নয়, হত্যা।”নয়নীর ফুফু পারভীন জানান, “নয়নী ছোটবেলায় আমাদের পরিবারের কাছেই ছিল। পরে আমির চাঁনের মাধ্যমে তাকে রইসউদ্দিনের বাড়িতে রাখা হয়। এরপর আমাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখা হয়নি।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, “তার গলায় দুইটি দাগ ছিল। মনে হয়েছে তাকে হত্যা করা হয়েছে। মৃত্যুর খবর পেয়ে আমি ঘটনাস্থলে গেলে আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়। আরেক স্বজন মোস্তাক অভিযোগ করেন, “অনেক আগেই মেরে ফেলা হয়েছিল। হাজি লাশ গোপন করার চেষ্টা করছিল। তাছাড়া তাকে এসিড দিয়ে ঝলসানো হয়েছে। যারা লাশ গোসল করিয়েছিল তারা দেখেই বলেছে যে, লাশ গর্ভবতী ছিল।”
নয়নীর নিকটাত্মীয় দাদা আমির চাঁন বলেন, “ঘটনার দিন আমাকে ফোন করে বাড়িতে ডাকা হয়। সেখানে গিয়ে দেখি লাশ বিছানায় পড়ে আছে। ফাঁসির কোনো স্বাভাবিক চিহ্ন ছিল না। লাশ দেখে বাড়ির বাইরে আসতে চাইলে হাজীর বাড়ির লোকজন আমাদেরকে বাইরে আসতে দেয় নি। তখনই আমাদের সন্দেহ হয়। মনে হয়েছে এটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড,কোনক্রমেই আত্মহত্যা নয়।
নয়নীর স্বজনদের অভিযোগ, মামলা গ্রহণে গড়িমসি করা হয়েছে এবং থানায় অসৌজন্যমূলক আচরণের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
এ বিষয়ে নয়নীর আরেক দাদা গ্রাম্য ডাক্তার রেজাউল হক চৌধুরী বলেন, “নয়নীকে হাজী রইসউদ্দিনের বাড়ির লোকজন নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করেছে এবং ঘটনা ধামা-চাপা দিতে ফাঁসির নাটক সাজিয়েছে। তিনি আরও বলেন, থানার পুলিশরা জানায় যে এটা অপমৃত্যু নয়। নয়নীকে মার্ডার করা হয়েছে। এজাহার দায়েরের কথা বললে আমাদের জানানো হয় লাশ পোস্ট মর্টেম করার পর মামলা দায়ের করা হবে। পরবর্তীতে থানায় এজাহার দায়ের করতে গেলে থানা পুলিশ মামলা গ্রহণ না করে আমাদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করে।”
নয়নীর দাদা সোহবুল হক বলেন, “আমি থানায় গেলে পুলিশ আমার সাথে অসদাচরণ করে এবং নানা ধরণের প্রশ্ন করে বিব্রত করে। পরে লাশ হস্তান্তর করে। এদিকে ঘটনার পরদিন সকালে আমাকে রইসউদ্দিন হাজীর পক্ষ থেকে প্রথমে এক লক্ষ টাকা ও পরে দুই লক্ষ টাকা দিয়ে ম্যানেজ করার চেষ্টা করে। কিন্তু আমি তাতে রাজী না হওয়ায় তারা ব্যর্থ হন। আমি এ হত্যাকান্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।”
এ বিষয়ে শিবগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মতিউর রহমান বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি লাশ শোয়ানো অবস্থায় ছিল। এটি ফাঁসিতে ঝুলানো মনে হয়নি। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ বলা যাচ্ছে না।” তিনি আরও জানান, ঘটনাটি তদন্তাধীন এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্বজনদের আশঙ্কা, প্রভাবশালী মহল ময়নাতদন্তের রিপোর্ট প্রভাবিত করতে পারে। তারা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
ক্যাপশন : খানেই নয়নীকে দাফন করা হয়।
এদিকে ঘটনার পর থেকে রইসউদ্দিনের বাড়ি তালাবদ্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযুক্ত নোমানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেন নি। উক্ত ঘটনায় ময়না তদন্তের রিপোর্ট প্রদানকারী চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালের ই.এম.ও ডা. রাশেদ জানান, “নয়নীর মৃত দেহের ময়না তদন্তের রিপোর্টে এসিড নিক্ষেপ, আঘাত ও গর্ভবতীর কোন আলামত পাওয়া যায় নি। তিনি আরও জানান, নয়নী স্বেচ্ছায় গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।”
এদিকে কিশোরী গৃহপরিচারিকার এমন মর্মান্তিক ও রহস্যজনক মৃত্যুতে গোটা শিবগঞ্জ উপজেলায় তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, প্রভাবশালী মহল ময়নাতদন্তের রিপোর্ট প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে পারে। তাই ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।#