
মোহা: সফিকুল ইসলাম, শিবগঞ্জ প্রতিনিধি: পদ্মা নদী বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী। এই নদী যেমন কৃষি, অর্থনীতি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নদীতীরবর্তী মানুষের জন্য এটি দীর্ঘদিন ধরে এক ভয়াবহ আতঙ্কের নাম। বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে পদ্মা নদীর ভাঙন বছরের পর বছর ধরে মানুষের বসতভিটা, আবাদি জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার ও সামাজিক অবকাঠামো কেড়ে নিচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে নদী এখন শুধু জীবনের অংশ নয়, বরং প্রতিদিনের অনিশ্চয়তার কারণ।
শত বছরেরও বেশি সময় ধরে এই অঞ্চলে নদীভাঙনের ঘটনা ঘটছে বলে স্থানীয় ইতিহাস ও বিভিন্ন নথিতে উল্লেখ পাওয়া যায়। সময়ের সঙ্গে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়েছে, নতুন চর জেগেছে, আবার পুরোনো জনপদ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ফলে এক প্রজন্মের মানুষ যে জায়গাকে নিজের জন্মভূমি হিসেবে চিনেছে, পরবর্তী প্রজন্মকে কখনো কখনো সেই জায়গার অস্তিত্বই খুঁজে পেতে হয়েছে মানচিত্রে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, বর্ষা মৌসুমে ভাঙনের তীব্রতা এতটাই বেড়েছে যে মানুষ ঘর সরানোর সময়ও ঠিকমতো পাচ্ছেন না। গত কয়েক বছরে পাঁকা, দুর্লভপুর ও উজিরপুর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকায় বসতবাড়ি ও কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এভাবে ভাঙন চলতে থাকলে ভবিষ্যতে শিবগঞ্জের আরও কতটা এলাকা নদীর গ্রাসে চলে যাবে?
চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মার ভাঙন নতুন কোনো ঘটনা নয়। স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই এ অঞ্চলের নদীতীরবর্তী মানুষ ভাঙনের সঙ্গে লড়াই করে আসছেন। ১৯১৮ সালের দিকে তৎকালীন চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহকুমার নারায়ণপুর এলাকায় ভাঙনের ঘটনা ঘটেছিল বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
এরপর বিভিন্ন সময়ে নদী আবারও তার গতিপথ পরিবর্তন করেছে। বিশেষ করে ষাটের দশক এবং স্বাধীনতার পরবর্তী কয়েক বছরে ভয়াবহ ভাঙনে বহু আবাদি জমি ও বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে যায়। স্থানীয় মানুষের বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৬৫ সালের দিকে মনাকষা ইউনিয়নের রাঘববাটি, গোপালপুর, রানীনগরসহ কয়েকটি এলাকায় ব্যাপক ভাঙন দেখা দেয়।

পরবর্তীতে ১৯৭০ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত রানীনগর, সিংনগর, হাঙ্গামীসহ বিভিন্ন গ্রাম ভাঙনের শিকার হয়। অনেক পরিবার তখন বাধ্য হয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যায়। কেউ নাচোল, কেউ ভোলাহাট, কেউ দিনাজপুর বা চট্টগ্রামের দিকে পাড়ি জমায়। অর্থাৎ নদীভাঙন শুধু জমি কেড়ে নেয়নি, মানুষের ভৌগোলিক পরিচয়ও বদলে দিয়েছে।
বর্তমানে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র এক মাসের মধ্যে পদ্মায় দুই শতাধিক বাড়িঘর এবং শতাধিক বিঘা আবাদি জমি বিলীন হয়েছে।
পাঁকা ইউনিয়নের গমের চরসহ বিভিন্ন এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা এতটাই বেশি যে অনেক পরিবার ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার সুযোগও পাচ্ছে না। একটি বাড়ি আজ নদী থেকে নিরাপদ মনে হলেও কয়েক দিন পর সেটিই ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়ে যাচ্ছে। এই অনিশ্চয়তা নদীপাড়ের মানুষের জীবনকে অসহনীয় করে তুলেছে।
একজন মানুষ জীবনে একবার বাড়ি হারালে সেটি বড় দুর্যোগ। কিন্তু একই মানুষ যদি বারবার বাড়ি হারান, তাহলে সেটি শুধু দুর্যোগ নয়—এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকট। স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্যে সেই বাস্তবতাই উঠে এসেছে।
পাঁকা ইউনিয়নের গমের চর এলাকার বাসিন্দা মো. একরামুল হকের বক্তব্য পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝাতে যথেষ্ট। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পদ্মার ভাঙনে তাঁর ঘরবাড়ি বহুবার ভেঙেছে। কয়েক বছর আগে বাড়ি সরানোর পর আবারও ভাঙনের মুখে পড়তে হয়েছে।
সরদার পাড়ার বাসিন্দারাও একই ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। একবার বাড়ি সরিয়ে নতুন জায়গায় বসতি স্থাপনের পর আবারও নদী সেই বসতিকে হুমকির মুখে ফেলছে। ফলে মানুষ শুধু বাড়ি হারানোর ভয়েই নেই; নতুন করে কোথায় বাড়ি করবে, সেটিও তাদের কাছে বড় প্রশ্ন।
শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁকা, দুর্লভপুর ও উজিরপুর ইউনিয়ন পদ্মা নদীর ভাঙনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে রয়েছে। সরকারি পরিকল্পনা নথিতেও শিবগঞ্জের কয়েকটি ইউনিয়নে নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে ভাঙনের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
উজিরপুর ইউনিয়নের ঘটনা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। স্থানীয়দের মতে, ইউনিয়নের বড় অংশ নদীগর্ভে চলে যাওয়ায় সেখানকার বাসিন্দারা বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছেন। অর্থাৎ একটি প্রশাসনিক এলাকার অস্তিত্ব কমে গেলে শুধু জমিই হারায় না; হারিয়ে যায় একটি পুরোনো সামাজিক কাঠামো।
পাঁকা ও দুর্লভপুরের ক্ষেত্রেও একই ধরনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কিছু গ্রাম ইতোমধ্যে বিলীন হয়েছে, আবার কয়েকটি গ্রাম এখনো মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।
একটি ইউনিয়ন যখন নদীর কারণে কার্যত বসতিহীন হয়ে যায়, তখন তার প্রভাব বহু বছর ধরে থাকে। সেখানকার মানুষকে নতুন জায়গায় গিয়ে আবার জীবন শুরু করতে হয়। নতুন জায়গায় জমি কেনা, বাড়ি নির্মাণ, সন্তানদের স্কুলে ভর্তি এবং জীবিকার ব্যবস্থা করা—সবকিছুই কঠিন হয়ে পড়ে।
উজিরপুরের অভিজ্ঞতা তাই অন্য ইউনিয়নের জন্য একটি সতর্কবার্তা। সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে একই পরিস্থিতি অন্য এলাকাতেও তৈরি হতে পারে।
নদীভাঙনের ক্ষতি শুধু মানুষের ঘরবাড়িতে সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, মসজিদ, মন্দির ও কবরস্থানও ভাঙনের শিকার হয়েছে বা ঝুঁকিতে রয়েছে।
স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, পাঁকা-নারায়ণপুর পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়, পাঁকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চর পাঁকা সরদারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং গমের চর প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে হলদিবোনা হাট, তেলিখাড়ি হাটসহ বিভিন্ন বাজারও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
একটি স্কুল নদীতে চলে গেলে শুধু একটি ভবন হারায় না। শত শত শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ব্যাহত হয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নতুন জায়গায় যাতায়াত করতে হয় এবং অনেক শিশুর শিক্ষাজীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
নদীভাঙনের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে আবাদি জমি হারানো। স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, পাঁকা, দুর্লভপুর ও উজিরপুর এলাকায় গত কয়েক বছরে প্রায় দুই হাজার হেক্টর কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
কৃষিজমি হারানো মানে শুধু একটি জমির মালিকানা হারানো নয়। এর সঙ্গে একজন কৃষকের ভবিষ্যৎ আয়, ফসল উৎপাদন, পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা এবং স্থানীয় বাজারের অর্থনৈতিক কার্যক্রমও জড়িয়ে থাকে।
একজন কৃষক জমি হারালে তিনি হয়তো দিনমজুরিতে চলে যান। ব্যবসায়ী ক্রেতা হারান, পরিবহন শ্রমিক পণ্য পরিবহনের কাজ হারান, স্থানীয় দোকানদার ক্রেতা হারান। অর্থাৎ নদীভাঙন ধীরে ধীরে পুরো স্থানীয় অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করে।

পদ্মার প্রবাহের সঙ্গে ভারতের গঙ্গা নদীর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশে প্রবেশের পর গঙ্গা পদ্মা নামে পরিচিত। এই নদী ব্যবস্থার উজানে ভারতের ফারাক্কা বাঁধ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশ মনে করেন, বর্ষা মৌসুমে উজানের পানির প্রবাহ ও নদীর স্রোতের পরিবর্তনের সঙ্গে ভাঙনের সম্পর্ক রয়েছে। তবে নদীভাঙনের কোনো নির্দিষ্ট ঘটনাকে শুধুমাত্র ফারাক্কা বাঁধের কারণে হয়েছে বলে চূড়ান্তভাবে দাবি করার আগে বৈজ্ঞানিক জলপ্রবাহ ও নদী-গতি বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
কারণ নদীভাঙন একটি জটিল প্রক্রিয়া। পানির প্রবাহ, নদীর গভীরতা, পলি জমা, তীরের মাটির গঠন এবং নদীর গতিপথ—সবকিছু মিলেই ভাঙনের ধরন নির্ধারিত হয়।
নদীভাঙন ঠেকাতে জরুরি সময়ে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ব্যবহার করা হয়। এগুলো কোনো কোনো স্থানে সাময়িকভাবে নদীর তীর রক্ষায় কার্যকর হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি নদী ব্যবস্থাপনার বিকল্প হিসেবে শুধু জিও ব্যাগের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙন শুরু হওয়ার পর তড়িঘড়ি করে জিও ব্যাগ ফেলা হয়। কিন্তু নদীর স্রোত অন্যদিকে আঘাত করলে নতুন জায়গায় ভাঙন শুরু হয়। ফলে এক জায়গা রক্ষা করতে গিয়ে পাশের আরেকটি এলাকা ঝুঁকিতে পড়ে যেতে পারে।
এ কারণে বিশেষজ্ঞভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা, তীর সংরক্ষণ, সঠিক নকশার বাঁধ এবং নিয়মিত নদীর গতিপথ পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।
দীর্ঘদিন ধরেই নদীপাড়ের মানুষ স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন। সরকারের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময়ে পদ্মার তীর সংরক্ষণের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।
২০২৫ সালের প্রতিবেদনে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পদ্মার ভাঙন রোধে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ নদী সংরক্ষণ প্রকল্পের প্রস্তাবের কথা প্রকাশিত হয়েছিল।
২০২৬ সালের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে শিবগঞ্জের পূর্বতীর সংরক্ষণে প্রায় ৭৪৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদনের খবরও এসেছে।
প্রকল্পের ব্যয়, পরিধি ও বাস্তবায়নের সময় সরকারি অনুমোদন ও দরপত্র প্রক্রিয়ার সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা জরুরি।
নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য শুধু কিছু শুকনো খাবার বা সাময়িক সহায়তা যথেষ্ট নয়। একটি পরিবার ঘর হারালে তাকে নিরাপদ জায়গায় বসতি, পানীয় জল, স্যানিটেশন, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং জীবিকার সুযোগ দিতে হবে।
বিশেষ করে যেসব পরিবার বারবার ঘর হারিয়েছে, তাদের জন্য স্থায়ী পুনর্বাসন পরিকল্পনা প্রয়োজন। নিরাপদ জায়গায় আবাসনের ব্যবস্থা না করলে তারা আবার নদীর কাছাকাছি গিয়ে বসতি স্থাপন করতে বাধ্য হতে পারেন।
ভাঙনপ্রবণ এলাকায় স্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি মোবাইল স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং জরুরি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালু করা হলে দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষ দ্রুত চিকিৎসা পেতে পারেন।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের একটি নির্ভুল ডাটাবেজও প্রয়োজন। কার বাড়ি কোথায় বিলীন হয়েছে, কত জমি হারিয়েছে, পরিবারটি কোথায় আশ্রয় নিয়েছে—এসব তথ্য সংরক্ষণ করা হলে পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ আরও স্বচ্ছভাবে দেওয়া সম্ভব হবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—ভাঙন অব্যাহত থাকলে শিবগঞ্জের ভবিষ্যৎ কী?
এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে পুরো উপজেলা নদীতে বিলীন হয়ে যাবে। নদীর গতিপথ, নতুন চর জাগা, প্রতিরক্ষা প্রকল্প এবং ভবিষ্যৎ পানিপ্রবাহের ওপর পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে।
তবে এটাও সত্য যে কোনো এলাকায় বছরের পর বছর জমি ও বসতি হারাতে থাকলে প্রশাসনিক ও সামাজিক কাঠামো বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখে পড়ে। তাই ভবিষ্যৎ বিপর্যয়ের জন্য অপেক্ষা না করে এখনই দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
শিবগঞ্জের নদীভাঙন মোকাবিলায় কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
পদ্মা নদীর ভাঙন শিবগঞ্জের জন্য শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি দীর্ঘস্থায়ী মানবিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট। শতাধিক বছর ধরে নদী তার গতিপথ বদলেছে, আর সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মূল্য দিয়েছে নদীতীরের সাধারণ মানুষ।
একজন মানুষ যদি জীবনে একবার বাড়ি হারান, সেটি দুর্ভাগ্য। কিন্তু যদি একই পরিবার বারবার বাড়ি হারায়, তাহলে সেটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য একটি বড় সতর্ক সংকেত।
স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, বৈজ্ঞানিক নদী ব্যবস্থাপনা, পুনর্বাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবিকার নিশ্চয়তা—সবকিছুকে একই পরিকল্পনার অংশ করতে হবে। কারণ নদীকে পুরোপুরি থামানো সম্ভব না হলেও নদীভাঙনে মানুষের জীবন ধ্বংস হওয়া অনেকটাই কমানো সম্ভব।
আজ যে গ্রামটি নদীর তীরে দাঁড়িয়ে আছে, কাল সেটি হয়তো থাকবে না। তাই প্রতিশ্রুতির সময় শেষ করে এখন প্রয়োজন বাস্তবায়নের সময়। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে হয়তো বহু পরিবার তাদের জন্মভূমি হারানোর হাত থেকে রক্ষা পাবে।
স্থানীয় ইতিহাস অনুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে পদ্মার ভাঙনের ইতিহাস শত বছরেরও বেশি পুরোনো। ১৯১৮ সালের দিকে নারায়ণপুর এলাকায় ভাঙনের ঘটনা ঘটেছিল বলে স্থানীয় তথ্যসূত্রে উল্লেখ রয়েছে। সরকারি নথিতেও শিবগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় নদীর গতিপথ পরিবর্তনজনিত ভাঙনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমানে পাঁকা, দুর্লভপুর ও উজিরপুর সবচেয়ে বেশি আলোচিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মধ্যে রয়েছে। এছাড়া পদ্মাতীরবর্তী অন্যান্য এলাকাতেও ভাঙনের আশঙ্কা রয়েছে।
সাম্প্রতিক স্থানীয় প্রতিবেদনে পাঁকা, দুর্লভপুর ও উজিরপুর এলাকায় প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বসবাসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নদীর গতিপথ ও স্থানান্তরের কারণে সরাসরি ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে।
স্থায়ী বাঁধ ও নদীতীর সংরক্ষণ ব্যবস্থা নির্দিষ্ট এলাকায় ভাঙনের ঝুঁকি অনেক কমাতে পারে। তবে পদ্মা একটি গতিশীল নদী হওয়ায় কোনো প্রকল্পই শতভাগ নিশ্চয়তা দিতে পারে না। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, নদীর গতিপথ পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।
সবচেয়ে জরুরি হলো অনুমোদিত নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা, ভাঙনকবলিত পরিবারকে পুনর্বাসন করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জনসেবা অবকাঠামো রক্ষা করা। একই সঙ্গে আশ্রয়কেন্দ্র, নৌ-অ্যাম্বুলেন্স, মোবাইল স্বাস্থ্যসেবা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য স্বচ্ছ সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: রোকনুজ্জামান রোকন নির্বাহী সম্পাদক: ইফতেখার আলম সম্পাদক কর্তৃক উত্তর নওদাপাড়া, পো: সপুরা, রাজশাহী-৬২০৩ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল: ০১৭১১-২০৮ ১৭২, ০১৮৩৪-৮৬১ ০০৭ ইমেইল: dainiksobujnagar@gmail.com
Copyright © 2025 দৈনিক সবুজ নগর