___ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: একটি রাষ্ট্রের সার্থকতা কেবল তার জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে নয়, বরং তার নাগরিকদের বৈচিত্র্য রক্ষার সক্ষমতায় নিহিত। বাংলাদেশ তার জন্মলগ্ন থেকেই অসাম্প্রদায়িকতা ও সাম্যের স্বপ্ন বুকে ধারণ করেছে। তবে আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের এমন এক বাংলাদেশ গড়া প্রয়োজন যেখানে বহুমাত্রিকতা হবে মূল শক্তি। যেখানে আস্তিক-নাস্তিক, সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু কিংবা পাহাড়-সমতলের ব্যবধান ঘুচিয়ে মানুষ তার আপন পরিচয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। গোলাপের সুবাসের পাশাপাশি বুনো ঘাসফুলের অস্তিত্বকেও স্বীকৃতি দেওয়া আজ সময়ের দাবি।
১. ধর্মীয় ও আদর্শিক সহাবস্থান: সকল বিশ্বাসের আশ্রয়স্থল বাংলাদেশ সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা উল্লেখ থাকলেও, প্রকৃত গণতন্ত্রে কেবল ধর্ম পালন নয়, বরং অবিশ্বাসীদেরও নিরাপদে বসবাসের অধিকার সুনিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
ধর্মীয় সম্প্রীতি: মসজিদ-মন্দির-গির্জা-প্যাগোডার পাশাপাশি সাঁওতাল বা খাসিয়াপল্লীর মাদলের শব্দ যেন আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়।
মতাদর্শিক উদারতা: সমাজ যখন ভিন্নমত বা অবিশ্বাসকে ধারণ করতে শেখে, তখন সেখানে উগ্রবাদ বা ঘৃণার চাষাবাদ বন্ধ হয়ে যায়। একটি প্রগতিশীল রাষ্ট্রে 'ঘৃণার চাষাবাদ' নয়, বরং 'তর্কের সংস্কৃতি' বলবৎ থাকা উচিত।
২. আইনের শাসন ও নারীর অধিকার: মেরুদণ্ড গঠন একটি রাষ্ট্র কতটুকু সভ্য, তা পরিমাপ করা হয় সেই রাষ্ট্রে নারী কতটা নিরাপদ তার ওপর ভিত্তি করে।
নারীর ক্ষমতায়ন: নারীকে কেবল অর্থনৈতিক যন্ত্র হিসেবে নয়, বরং একজন স্বতন্ত্র মানুষ হিসেবে মাথা উঁচু করে বাঁচার পরিবেশ দিতে হবে।
আইনের শাসন: বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করে আইনের চোখে উচ্চবিত্ত ও সাধারণ মানুষের সমতা নিশ্চিত করতে হবে। যখন আইন পক্ষপাতহীন হয়, তখন সমাজের প্রান্তিক মানুষগুলোও কথা বলার সাহস পায়।
৩. গণতন্ত্রের চাষবাস: বহু চিন্তা ও বহু স্বর গণতন্ত্র মানে কেবল ভোটদান নয়, এটি হলো বহু চিন্তার সমাহার।
তারেক জিয়া থেকে হিরো আলম: রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী আলোচনায় যেমন ঝানু রাজনীতিকদের প্রয়োজন আছে, তেমনি প্রান্তিক পর্যায় থেকে উঠে আসা 'হিরো আলম'দের মতো মানুষদের কণ্ঠস্বরও গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
মৃদু চিৎকার ও ভদ্রোচিত ভাষা: ভিন্নমত প্রকাশ মানেই সংঘাত নয়। অসংগতি দেখে নাগরিকরা যদি ভদ্রোচিত ভাষায় 'মৃদু চিৎকার' বা প্রতিবাদ করতে পারে, তবেই শাসনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বজায় থাকে।
৪. সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য: বাগানের পূর্ণতা একটি সুন্দর বাগানে কেবল দামী গোলাপ থাকলে চলে না, ছোট ছোট ঘাসফুলগুলো সেই বাগানের সৌন্দর্য পূর্ণ করে।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী: খাসিয়া, সাঁওতাল, চাকমাসহ সকল জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষার পরিবেশ রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে।
অন্তর্ভুক্তি: যখন রাষ্ট্রের সকল স্তরে বৈচিত্র্যময় মানুষের অংশগ্রহণ থাকে, তখন সেই রাষ্ট্র মানসিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ কোনো একক গোষ্ঠীর বা একক চিন্তার ভূখণ্ড নয়। এটি একটি বহুমাত্রিক ক্যানভাস। এখানে ভিন্ন ধর্ম, ভিন্ন মত এবং ভিন্ন জীবনবোধের মানুষ যখন একত্রে মিলেমিশে থাকবে, তখনই প্রকৃত 'গণতন্ত্রের চাষবাস' সফল হবে। আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়ার শপথ নিই, যেখানে ঘৃণা নয়, বরং ভালোবাসা আর সহনশীলতাই হবে আমাদের মূল পরিচয়। গোলাপ আর ঘাসফুলের মেলবন্ধনে গড়ে উঠুক এক অনন্য বাংলাদেশ!...#
লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: রোকনুজ্জামান রোকন নির্বাহী সম্পাদক: ইফতেখার আলম সম্পাদক কর্তৃক উত্তর নওদাপাড়া, পো: সপুরা, রাজশাহী-৬২০৩ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল: ০১৭১১-২০৮ ১৭২, ০১৮৩৪-৮৬১ ০০৭ ইমেইল: dainiksobujnagar@gmail.com
Copyright © 2025 দৈনিক সবুজ নগর