ছবি: সংগৃহীত
__ ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: বাঙালি জাতির ইতিহাসে ২৫শে মার্চ একটি শোকাবহ, ভয়াল ও কলঙ্কিত অধ্যায়। ১৯৭১ সালের এই দিনে মধ্যরাতে পাক-হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র, ঘুমন্ত বাঙালির ওপর 'অপারেশন সার্চলাইট' নামে যে বর্বরোচিত হামলা চালিয়েছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম জঘন্যতম গণহত্যা হিসেবে চিহ্নিত। আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে একটি সুসংগঠিত সামরিক বাহিনী যখন নিজেদেরই সাধারণ মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন তা আর যুদ্ধ থাকে না—হয়ে ওঠে এক নারকীয় হত্যাকাণ্ড। এই দিনটি বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল এক কালরাত্রি হিসেবেই ভাস্বর হয়ে থাকবে।
অপারেশন সার্চলাইট: ষড়যন্ত্র ও প্রেক্ষাপট ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জিত হলেও তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে। অসহযোগ আন্দোলনের মুখে আলোচনার আড়ালে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে গোপনে সৈন্য ও মারণাস্ত্র আনা হতে থাকে। জেনারেল ইয়াহিয়া খান, জেনারেল টিক্কা খান এবং জেনারেল রাও ফরমান আলীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে প্রণীত হয় বাঙালি নিধনের নীল নকশা—'অপারেশন সার্চলাইট'।
এর মূল লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক নেতৃত্বকে গ্রেপ্তার, বুদ্ধিজীবীদের নিশ্চিহ্ন করা এবং সাধারণ মানুষের মনে ত্রাস সৃষ্টি করে বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন চিরতরে ধূলিসাৎ করে দেওয়া। নৃশংসতার খতিয়ান ও ভয়াবহতা ২৫শে মার্চ রাত ১১টা ৩০ মিনিটের দিকে ঢাকা সেনানিবাস থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ট্যাংক, মর্টার এবং মেশিনগান নিয়ে শহরের বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে। রক্তের নেশায় মত্ত হয়ে তারা আক্রমণ চালায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, ইকবাল হল (বর্তমান জহুরুল হক হল) এবং শিক্ষকদের আবাসস্থলে। পিলখানা ও রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করা হলেও কামানের গোলার আঘাতে তা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। পুরান ঢাকার শাঁখারিবাজার ও তাঁতীবাজার এলাকায় আগুন ধরিয়ে দিয়ে পলায়নরত মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও ঐতিহাসিকদের মতে, শুধুমাত্র সেই রাতেই ঢাকা শহরে নিহতের সংখ্যা ছিল ৫,০০০ থেকে ১০,০০০-এরও বেশি। স্বাধীনতার ঘোষণা ও প্রতিরোধের সূচনা এই নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেই ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে (অর্থাৎ ২৫শে মার্চ দিবাগত রাত ১২টা ২০ মিনিটের পর) বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তাঁর এই ঘোষণা ওয়্যারলেস বার্তার মাধ্যমে দ্রুত সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং এর পরপরই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বঙ্গবন্ধুর এই স্বাধীনতার ঘোষণাকে ত্বরান্বিত করতে এবং জনমনে মনোবল সঞ্চার করতে ২৭শে মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তৎকালীন সেনাবাহিনীর মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণাটি পাঠ করেন। এই ঘোষণাটি মুক্তিকামী মানুষের মাঝে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে সশস্ত্র প্রতিরোধের সূচনা ঘটায়। সেই কালরাত্রির বীভৎসতা বাঙালিকে ভয় পাইয়ে দেওয়ার বদলে আরও ঐক্যবদ্ধ করে তোলে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দীর্ঘদিন অবহেলিত থাকলেও ২০১৭ সালে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে ২৫শে মার্চকে 'জাতীয় গণহত্যা দিবস' হিসেবে পালনের প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
আন্তর্জাতিক মহলেও এই দিনটিকে বৈশ্বিক গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি এখন বিশ্বজনীন। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, স্বাধীনতার মূল্য অনেক রক্ত আর ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে।
উপসংহার: ২৫শে মার্চের কালরাত্রি কেবল মৃত্যু আর ধ্বংসের গল্প নয়, এটি বাঙালির ঘুরে দাঁড়ানোর মাহেন্দ্রক্ষণ। পাকিস্তানি জান্তা ভেবেছিল অস্ত্রের মুখে বাঙালিকে স্তব্ধ করে দেবে, কিন্তু রক্তস্নাত সেই রাতই জন্ম দিয়েছিল অদম্য এক প্রতিরোধের, যা মাত্র নয় মাস পর ১৬ই ডিসেম্বর বিজয়ের রূপ নেয়। আজ আমরা যখন একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে বাস করছি, তখন সেই রাতে আত্মত্যাগকারী শহীদদের প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা জানানো এবং তাঁদের ত্যাগের মহিমাকে অন্তরে ধারণ করা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব!#
... লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক