____ ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম:
ভূমিকা মানব সমাজে ন্যায়বিচার, সত্য, মানবতা এবং সাম্য প্রতিষ্ঠার পথ সর্বদা কণ্টকাকীর্ণ, বন্ধুর ও বৈরী। সমাজ যখন অন্যায়, অনাচার, শোষণ, দুর্নীতি এবং বৈষম্যের সর্বগ্রাসী জালে আচ্ছন্ন থাকে, তখন তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া প্রতিটি সচেতন, বিবেকবান ও দায়িত্বশীল মানুষের প্রাথমিক নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। কিন্তু প্রশ্ন হলো—চারপাশের চরম অবিচার, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পচন দেখেও যদি কারো জীবনে কখনো কোনো ধরনের বিরোধ বা সংঘাতের সৃষ্টি না হয়, তবে তার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বা অর্থ কী? সাধারণ ও অগভীর দৃষ্টিতে একে সামাজিক শান্তি, ভদ্রতা, নির্ঝঞ্ঝাট জীবনযাপন কিংবা প্রজ্ঞার লক্ষণ মনে করা হলেও, গভীর দার্শনিক, মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এটি নিছক শান্তি নয়; বরং এটি এক ধরনের নৈতিক পক্ষাঘাত, চারিত্রিক দুর্বলতা কিংবা অপরাধমূলক নিষ্ক্রিয়তা হিসেবে প্রতিভাত হয়। অনাচার ও অন্যায়ের প্রতিবাদে যেখানে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ ও সংঘাত অবধারিত হওয়া উচিত, সেখানে নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ জীবনযাপন কেবল সুবিধাবাদী আপসকামিতাকেই নির্দেশ করে।
সত্যের প্রকাশ ও অবশ্যম্ভাবী সংঘাত: একটি দার্শনিক প্রেক্ষাপট দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে, সত্য এবং ন্যায়বিচার হলো এমন এক মৌলিক ও গতিশীল শক্তি যা অসত্য, মিথ্যা, আধিপত্য এবং অন্যায়ের মূল ভিত্তি আমূল নাড়িয়ে দেয়। সক্রেটিস থেকে শুরু করে যুগে যুগে সত্যসন্ধানীরা সমাজের প্রচলিত অন্যায় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন এবং এর ফলে তারা শাসকদের রোষানল, কারাবাস, নির্যাতন ও নানা সামাজিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন।
অস্তিত্ববাদী দর্শন ও নৈতিক দায়বদ্ধতা: ফরাসি দার্শনিক জঁ-পল সার্ত্র বা আলবেয়ার কামুর অস্তিত্ববাদী দর্শনে ব্যক্তির স্বাধীনতার পাশাপাশি তার চরম দায়বদ্ধতার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সার্ত্রের মতে, নিষ্ক্রিয়তাও এক ধরনের পছন্দ। অন্যায় দেখেও নীরব থাকা মানে পরোক্ষভাবে অন্যায়ের পক্ষ নেওয়া, নিজের মানবীয় সত্তাকে অস্বীকার করা এবং নৈতিক স্বাধীনতাকে বিসর্জন দেওয়া।
কান্টীয় সদিচ্ছা ও কণ্টকাকীর্ণ পথ: জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের মতে, নৈতিক কর্তব্য পালনের জন্য প্রয়োজন নিঃশর্ত সদিচ্ছা (Good Will)। সমাজব্যবস্থা যখন পুরোপুরি দুর্নীতিগ্রস্ত ও পাপাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তখন সততার সঙ্গে মাথা উঁচু করে বাঁচতে গেলে সংঘাত অনিবার্য হয়ে পড়ে। সুবিধাবাদী পথ ছেড়ে সত্যের পথ মাড়াতে গেলেই বিরোধের সৃষ্টি হয়। অতএব, যার জীবনে কখনো কোনো বিরোধ বা সংঘাতের সৃষ্টি হয়নি, ধরে নিতে হবে তিনি কখনো ক্ষমতার অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াননি। তিনি কেবল স্রোতের প্রতিকূলে না হেঁটে গা ভাসিয়ে দিয়েছেন, যা সত্য প্রতিষ্ঠার পথে এক বিরাট অন্তরায়। আত্মপক্ষ সমর্থন ও সুবিধাবাদ: মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে, সংঘাত ও ঝামেলা এড়িয়ে চলার প্রবণতা অনেক সময় মানুষের গভীর নিরাপত্তাহীনতা, ভীরুতা এবং আত্মকেন্দ্রিকতাকে প্রকাশ করে।
কমফোর্ট জোন বা আরামদায়ক ক্ষেত্র: সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ সাধারণত কষ্ট, ঝুঁকি ও সংঘাত এড়াতে ‘প্রতিরক্ষা কৌশল’ (Defense Mechanism) ব্যবহার করে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে যে সামাজিক, অর্থনৈতিক বা পেশাগত ঝুঁকি তৈরি হয়, তা থেকে বাঁচতে মানুষ চোখ বন্ধ রাখার ও নির্বিবাদে দিন কাটানোর পথ বেছে নেয়।
‘ভালো মানুষ’ সাজার মুখোশ: সমাজে নিজেকে বিতর্কহীন, নির্ঝঞ্ঝাট ও সজ্জন হিসেবে জাহির করার এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ক্ষুধা কাজ করে অনেকের মধ্যে। এই শ্রেণির মানুষ নিজের সামান্য স্বার্থহানি এড়াতে বড় বড় অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয় এবং ভেতরে ভেতরে অপরাধবোধ এড়াতে নৈতিকতার বুলি আউড়ায়। মনস্তাত্ত্বিক বিচারে এটি একধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা, যা সমাজকে প্রগতির পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদী পতনের দিকে নিয়ে যায়।
তথ্য অনুসন্ধান, সমাজবিজ্ঞান ও অপরাধবিজ্ঞান: দর্শকের ভূমিকা সমাজবিজ্ঞান ও অপরাধবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, বড় বড় অপরাধ, রাষ্ট্রীয় শোষণ বা সামাজিক অনাচার দীর্ঘকাল টিকে থাকে মূলত নিষ্ক্রিয় দর্শকের (Bystander Effect) নীরব সমর্থনের কারণে।
নীরবতার সংস্কৃতি ও অপরাধের প্রসার: অপরাধ বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে, অপরাধীরা তখনই অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে যখন সমাজের একটি বড় অংশ অন্যায়ের প্রতিবাদ না করে কাপুরুষের মতো চুপ থাকে। এই নীরবতা অপরাধীকে আরও বেশি বেপরোয়া করে তোলে।
প্রতিবাদের সামাজিক ও ঐতিহাসিক মূল্য: ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, প্রতিটি সফল সামাজিক সংস্কার, স্বাধীনতা সংগ্রাম বা বিপ্লবের পেছনে রয়েছে তীব্র মতপার্থক্য, রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও সংঘাত। ১৮ শতকের প্রথমার্ধে দাসপ্রথা বিরোধী আন্দোলন বা পরবর্তীকালে উপনিবেশবিরোধী লড়াই—কোথাও আপস করে বা ঘরে বসে পরিবর্তন আসেনি। যারা সব সময় ঝামেলা এড়াতে চেয়েছেন, তারা পরিবর্তনের অংশীদার তো দূরের কথা, বরং পরিবর্তনের গতিকে শ্লথ ও বিপন্ন করেছেন। পৃথিবীর ইতিহাসে সকল সত্য ও অধিকারই তো প্রতিষ্ঠা হয়েছে প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়ে—কথা বলে, প্রতিবাদ করে, রক্ত দিয়ে ও সংগ্রাম করে। অন্যায় দেখেও যারা মুখে কুলুপ এঁটে থাকেন এবং বলেন, "আমি ঝামেলা পছন্দ করি না," তাদের নীরব অবস্থান ও নিষ্ক্রিয়তাকে ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ‘বোবা শয়তান’ (আওরাসাতুল হাক্ব বা সত্যের গোপনীয়তা রক্ষাকারী নির্বাক শক্তি) হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে; কারণ ন্যায়ের পক্ষে শব্দহীন থাকা প্রকারান্তরে অসত্য ও জুলুমকেই সহায়তা করে।
নিরাপত্তা ও সুবিধাবাদের আড়ালে মুনাফিকি চরিত্রের স্বরূপ "আমি ঝামেলা পছন্দ করি না" কিংবা "সবপক্ষকে খুশি রেখে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ"—এই ধরনের বুলি আউড়ে যারা সবসময় নিজেদের খোলসের মধ্যে গুটিয়ে থাকেন এবং চারপাশের অন্যায় দেখেও চোখ বন্ধ রাখেন, তাদের চরিত্র ও আচরণে মুনাফিকের কিছু সুনির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। নৈতিকতার বিচারে এই চরিত্রগুলো সমাজ ও সংস্কৃতির জন্য অত্যন্ত মারাত্মক। নিচে এই ধরনের সুবিধাবাদী ও মুখ বন্ধ রাখা চরিত্রের স্বরূপ তুলে ধরা হলো: ‘উভয়মুখী কূটনীতি’ বা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড: এই শ্রেণির মানুষেরা ভেতরে ভেতরে এক নীতি ধারণ করলেও সামনে প্রকাশ করে অন্য নীতি। যখন তারা অন্যায় বা ক্ষমতার অপব্যবহারের পক্ষের মানুষের সঙ্গে থাকে, তখন তাদের সুরে সুর মেলায় এবং তাদের অন্যায়কে বৈধতা দেয়। আবার নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে সাধারণ মানুষের সামনে নিজেদের খুব বড় প্রতিবাদী বা নীতিবান সাজানোর চেষ্টা করে। নিজের বিন্দুমাত্র ঝুঁকি না রেখে উভয় পক্ষকেই সন্তুষ্ট রাখার এই দ্বিচারিতাই ক্লাসিক মুনাফিকি চরিত্র।
সুবিধাবাদী নীরবতা ও ‘নিরপেক্ষতার মুখোশ’: সমাজ বা কর্মক্ষেত্রে যখন কোনো স্পষ্ট অন্যায়, দুর্নীতি বা নিপীড়ন চলে, তখন প্রকৃত সত্যকে জেনেশুনেও এরা নিজেদের ‘নিরপেক্ষ’ বলে দাবি করে। তারা বলে, "এসব ঝামেলায় আমি নেই, আমি সবার সাথেই ভালো সম্পর্ক রাখতে চাই।" হক ও বাতিলের লড়াইয়ে হক জেনেও যারা সত্যের পক্ষে মুখ খোলে না, তাদের নিরপেক্ষতা আসলে অপরাধের পক্ষেই নীরব সমর্থন। নিরপেক্ষতার এই মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকে চরম কাপুরুষতা এবং নিজের গদি বা স্বার্থ রক্ষা করার হীন স্বার্থপরতা।
আড়ালে সমালোচনা কিন্তু সামনে তোষামোদী: এই প্রকৃতির মানুষেরা সামনাসামনি কোনো অন্যায়কারী বা ক্ষমতাধর ব্যক্তির অন্যায় সিদ্ধান্তের চরম প্রশংসা করে এবং তাদের কৃপা পাওয়ার জন্য তোষামোদ করে বেড়ায়। অথচ আড়ালে বা নিরাপদে অন্য দশজনের কাছে সেই একই ব্যক্তির দুর্নীতির কথা বলে ধিক্কার জানায়। এটি মুনাফিকের অন্যতম প্রধান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, ইসলামের পরিভাষায় যাদের ‘দ্বিমুখী চরিত্রের মানুষ’ (যুল-ওয়াজহাইন) বলা হয়েছে। নিজের চামড়া বাঁচাতে অন্যকে বলির পাঁঠা বানানো: যখন কোনো প্রতিষ্ঠানে বা সমাজে কোনো অন্যায় বা দুর্নীতি ফাঁস হওয়ার উপক্রম হয়, তখন এই মুনাফিক চরিত্রগুলো সবচেয়ে আগে গা বাঁচিয়ে চলে। প্রয়োজনে যারা সত্যের পক্ষে কথা বলার চেষ্টা করছিল, তাদের বিপদাপন্ন জেনেও এই সুবিধাবাদীরা তাদের বিপদে ফেলে বা তাদের পিঠে ছুরি মারে, যাতে কর্তাব্যক্তিদের চোখে নিজেদের বিশ্বস্ত প্রমাণ করা যায়।
ব্যক্তিগত লাভের আশায় অন্যায়ে মৌন সম্মতি: চারপাশের মানুষ যখন অন্যায় সুবিধা নিচ্ছে বা কোনো অবৈধ কাজের মাধ্যমে সমাজকে ধ্বংস করছে, তখন নিজেরা সরাসরি সেই অপরাধে হাত না লাগালেও সেই অন্যায়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত সুবিধা ঠিকই পকেটে পুরে নেয়। মুখে সাধু সাজার ভান করলেও এরা ভেতরে ভেতরে অন্যায়ের অশুভ অংশীদার। নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক স্থবিরতা বিরোধ ও সংঘাত এড়ানোর এই মানসিকতা যখন সামগ্রিক সমাজদেহে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেখানে নৈতিক অবক্ষয় এবং সামাজিক স্থবিরতা অনিবার্য হয়ে ওঠে। মানুষ যখন দেখল যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে কেবল বিপদেই পড়তে হয়, তখন তারা নিজেদের গুটিয়ে নেয়। এই আত্মকেন্দ্রিক গণ্ডী সমাজের সামগ্রিক সংহতিকে ধ্বংস করে দেয়। ফলে সমাজ ধীরে ধীরে একটি স্বার্থপর ও পরাধীন মানসিকতার জনগোষ্ঠীর আখড়ায় পরিণত হয়, যেখানে ন্যায়ের চেয়ে সুবিধাভোগই বড় হয়ে দাঁড়ায়।
উপসংহার পরিশেষে বলা যায়, সংঘাতহীন জীবন মানেই পবিত্র, সাধু বা শান্তির জীবন নয়; বরং এটি অনেক সময় নিষ্ক্রিয়তা, আত্মকেন্দ্রিকতা, কাপুরুষতা এবং অন্যায়ের সঙ্গে এক ধরনের নীরব সমঝোতার বহিঃপ্রকাশ। যারা নিজেদের তথাকথিত ‘ভালো মানুষ’ সাজিয়ে সমাজ পরিবর্তনের কোনো ঝুঁকি নেন না, তারা মূলত ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। প্রকৃত নৈতিকতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন আপসহীন সাহসিকতা—যে সাহসিকতা অন্যায়কে চ্যালেঞ্জ জানাতে দ্বিধা করে না, প্রয়োজনে নিজের জীবনের আরাম-আয়েশ ও শান্তি বিসর্জন দিয়েও সত্যের পক্ষে অবস্থান নেয়। তাই তথাকথিত ঝামেলা এড়িয়ে চলা কোনো সাধুতা নয়, এটি মানবতা ও সমাজের বিরুদ্ধে এক গভীর নৈতিক অপরাধ!#
... লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক প্রাবন্ধিক ও সমাজচিন্তক।
