মোহা: সফিকুল ইলাম
নারী ও শিশু নির্যাতন কোনো বিচ্ছিন্ন সামাজিক সমস্যা নয়। এটি একটি সমাজের মানবিকতা, নৈতিকতা, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা এবং আইনের শাসনের গভীর পরীক্ষার নাম। একটি শিশু যখন নির্যাতনের শিকার হয়, তখন শুধু একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে যায় না; একটি প্রজন্মের নিরাপত্তাবোধও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
একইভাবে, কোনো নারী যখন পারিবারিক সহিংসতা, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, নির্যাতন, অপমান বা অনলাইন হয়রানির শিকার হন, তখন তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার পাশাপাশি সমাজের ন্যায়বোধও প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধ করতে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন, সামাজিক সচেতনতা, দ্রুত বিচার, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা এবং অপরাধীর জবাবদিহি—সবকিছুকে একই কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।
বাংলাদেশে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধের বিভিন্ন মানবাধিকার পর্যবেক্ষণও পরিস্থিতির উদ্বেগজনক দিকটি সামনে এনেছে। Human Rights Support Society-এর হিসাবে জানুয়ারি থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত ১,৬২১ নারী ও কিশোরী বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন। আগের বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১,০৪২, অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই পরিসংখ্যান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সমস্যা শুধু অপরাধীর মানসিকতায় আটকে নেই। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সামাজিক নীরবতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্বল সুরক্ষা ব্যবস্থা, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং ভুক্তভোগীর প্রতি দোষারোপের সংস্কৃতি। ফলে সমাধানও হতে হবে বহুমাত্রিক।
নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা আজ সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরে দেখা যাচ্ছে। ঘর থেকে রাস্তা, কর্মক্ষেত্র থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণপরিবহন থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—কোনো জায়গাই পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়।
শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, পারিবারিক সহিংসতা, বাল্যবিবাহ, অপহরণ, হত্যা, যৌতুকের জন্য নির্যাতন, মানসিক নিপীড়ন এবং অনলাইন হয়রানি—এসব অপরাধের ধরন আলাদা হলেও এর পেছনে একটি সাধারণ বিষয় রয়েছে: দুর্বল ব্যক্তির ওপর ক্ষমতার অপব্যবহার।
শিশুর ক্ষেত্রে সমস্যা আরও গুরুতর। একটি শিশু অনেক সময় বুঝতেই পারে না যে তার সঙ্গে অন্যায় হচ্ছে। আবার বুঝলেও প্রতিবাদ করার মতো সামাজিক ও মানসিক শক্তি তার থাকে না।
পরিবারের সদস্য, আত্মীয়, পরিচিত ব্যক্তি, শিক্ষক, প্রতিবেশী বা ক্ষমতাবান কেউ অপরাধী হলে শিশুর পক্ষে ঘটনা প্রকাশ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে দৃশ্যমান ঘটনার চেয়ে বাস্তব ঘটনার সংখ্যা অনেক বেশি হতে পারে—এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
নারী ও শিশু নির্যাতনকে শুধু “আইনশৃঙ্খলার সমস্যা” হিসেবে দেখলে এর সামাজিক শিকড় অদৃশ্য থেকে যায়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা, শিশুকে শাসনের নামে সহিংসতা গ্রহণযোগ্য মনে করা, পারিবারিক সম্মানের ভুল ধারণা, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং অপরাধীর প্রতি সামাজিক বা রাজনৈতিক আশ্রয়।
একটি সভ্য সমাজের অগ্রগতি তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেখানে সবচেয়ে দুর্বল মানুষটিও ভয় ছাড়াই বলতে পারে—“আমার সঙ্গে অন্যায় হলে রাষ্ট্র আমাকে রক্ষা করবে।”
নারী ও শিশু নির্যাতনের ভয়াবহতা বোঝার জন্য শুধু ধর্ষণ বা হত্যার পরিসংখ্যান দেখলেই হবে না। একটি শিশুকে নিয়মিত মারধর করা, ভয় দেখানো, অপমান করা, স্কুলে যেতে বাধা দেওয়া বা বাল্যবিবাহে বাধ্য করাও তার অধিকার লঙ্ঘন।
একইভাবে, একজন নারীকে স্বামীর হাতে মারধরের শিকার হতে হওয়া, যৌতুকের জন্য চাপ দেওয়া, অর্থনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা, সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা বা অনলাইনে অপমান করাও সহিংসতার অংশ।
অনেক ক্ষেত্রে শারীরিক আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। কিন্তু মানসিক নির্যাতনের ক্ষত বাইরে থেকে দেখা যায় না। অথচ সেটি বছরের পর বছর একজন মানুষের আত্মবিশ্বাস ও জীবনযাত্রাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও অনুমতি ছাড়া প্রকাশ, ভুয়া ছবি তৈরি, হুমকি, সাইবার স্টকিং এবং যৌন হয়রানিও নির্যাতনের নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ফলে নারী ও শিশু সুরক্ষার ধারণাকেও এখন ঘরের চার দেয়ালের বাইরে নিয়ে ডিজিটাল জগত পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে।
নারী ও শিশু নির্যাতনের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিকগুলোর একটি হলো নীরবতা। অনেক পরিবারে এখনও মনে করা হয়, ঘরের বিষয় বাইরে প্রকাশ করলে পরিবারের সম্মান নষ্ট হবে।
ফলে একজন নির্যাতিত নারী বছরের পর বছর সহিংসতা সহ্য করেন। তিনি জানেন না কোথায় যাবেন, কীভাবে আইনি সহায়তা পাবেন কিংবা মামলা করলে তার ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ কী হবে।
শিশুরাও অনেক সময় অপরাধীর হুমকি, ভয় বা পরিবারের চাপের কারণে ঘটনা প্রকাশ করে না। কখনও আবার অভিযোগ করার পর সমাজই ভুক্তভোগীকে প্রশ্ন করতে শুরু করে—সে কোথায় ছিল, কী পোশাক পরেছিল, কেন প্রতিবাদ করেনি বা কেন আগে বলেনি।
এই প্রশ্নগুলো অপরাধীর দায়কে আড়াল করে এবং ভুক্তভোগীর ওপর নতুন মানসিক বোঝা চাপায়। আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।
অপরাধের দায় অপরাধীর, ভুক্তভোগীর নয়।
পরিবারকে বুঝতে হবে, নির্যাতনের ঘটনা গোপন করে সংসার বা সামাজিক সম্মান রক্ষা করা যায় না। বরং অপরাধীকে নীরবে সহ্য করার সুযোগ দিলে ভবিষ্যতে আরও বড় বিপদ তৈরি হতে পারে।
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের তথ্য বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। HRSS-এর জানুয়ারি-জুন পর্যবেক্ষণে ১,৬২১ নারী ও কিশোরী সহিংসতার শিকার হয়েছেন।
একই প্রতিবেদনে ৪০৪টি ধর্ষণের ঘটনা, ৮৮টি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা এবং ধর্ষণের পর ১৭টি হত্যার তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একজন মানুষ, একটি পরিবার এবং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ও সামাজিক ক্ষতি।
আরেকদিকে, বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, এপ্রিল ২০২৬-এ সারাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ২,০১১টি মামলা নথিভুক্ত হয়। এটি আগের নয় মাসের মধ্যে একক মাসে সর্বোচ্চ এবং মার্চের ১,৪৮৫ মামলার তুলনায় ৩৫.৪ শতাংশ বেশি।
তবে মামলা বৃদ্ধির অর্থ সবসময় অপরাধ একই হারে বেড়েছে—এমন সরল সিদ্ধান্ত টানা যায় না। রিপোর্টিং, মামলা করার প্রবণতা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমও সংখ্যাকে প্রভাবিত করতে পারে।
তারপরও ধারাবাহিকভাবে এত বেশি অভিযোগ থাকা একটি শক্তিশালী সতর্ক সংকেত। এই পরিস্থিতির ভিত্তিতে রাষ্ট্রকে প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নতুন করে মূল্যায়ন করতে হবে।
নারী ও কিশোরীদের ওপর সহিংসতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কেন একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে?
কেবল অপরাধীকে গ্রেপ্তার করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে? যদি একজন অপরাধী জানেন যে মামলা হলেও বিচার শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে, সাক্ষী ভয় পেতে পারে, পরিবার সামাজিক চাপে আপস করতে পারে কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তিনি প্রভাব খাটাতে পারবেন, তাহলে আইনের ভয় দুর্বল হয়ে যায়।
অপরাধ প্রতিরোধে আইনের কঠোরতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি নিশ্চিত ও দ্রুত প্রয়োগ আরও গুরুত্বপূর্ণ। একটি কঠোর আইন যদি বাস্তবে কার্যকর না হয়, তাহলে সেটি কাগজে শক্তিশালী হলেও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না।
নারী নির্যাতনের ঘটনায় তদন্তের মান, ফরেনসিক সক্ষমতা, সাক্ষী সুরক্ষা, ভুক্তভোগীর আইনি সহায়তা এবং আদালতের সময় ব্যবস্থাপনা—সবগুলোকে শক্তিশালী করা দরকার।
একই সঙ্গে নারীকে অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম করে তুলতে হবে। কারণ অর্থনৈতিক নির্ভরতা অনেক ভুক্তভোগীকে নির্যাতনমূলক সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে বাধা দেয়।
নিরাপদ আশ্রয়, কাউন্সেলিং, আইনি সহায়তা এবং পুনর্বাসনের সুযোগ থাকলে অভিযোগ করার সাহসও বাড়বে।
শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধের তথ্য আরও হৃদয়বিদারক। Ain o Salish Kendra-এর তথ্য অনুযায়ী জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে সহিংসতার বিভিন্ন ঘটনায় ১৯৫ শিশু নিহত হয়েছে।
তাদের মধ্যে শারীরিক নির্যাতন ছিল মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। একই সময়ে ২১ শিশু ধর্ষণের পর নিহত হয়েছে বলেও তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
HRSS-এর পর্যবেক্ষণেও একই সময়ে ১,০৭৭ শিশুর বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৩০৫ শিশুর মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি আলাদা হওয়ায় সংখ্যাগুলো সরাসরি একসঙ্গে তুলনা করা উচিত নয়। তবে উভয় ধরনের তথ্যই শিশু সুরক্ষার গভীর সংকটের দিকে ইঙ্গিত করে।
শিশুকে শাসনের নামে মারধর, যৌন নির্যাতন, পারিবারিক সহিংসতা, অবহেলা এবং বাল্যবিবাহকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শিশুর জন্য নিরাপদ পরিবার, নিরাপদ স্কুল, নিরাপদ পরিবহন এবং নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের যৌথ দায়িত্ব।
বাংলাদেশে নারী ও শিশু সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন আইন, আদালত, হেল্পলাইন এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রয়েছে। সমস্যা হলো, আইন থাকা এবং আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা এক বিষয় নয়।
একজন ভুক্তভোগী যদি থানায় গিয়ে অভিযোগ করতে ভয় পান, তদন্ত যদি দীর্ঘ হয়, সাক্ষী যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন এবং মামলা যদি বছরের পর বছর চলে, তাহলে আইনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা দুর্বল হয়।
শেষ পর্যন্ত অপরাধী যদি শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারেন, তাহলে সম্ভাব্য অপরাধীর কাছেও ভুল বার্তা যায়। তাই আইনের কঠোরতা এবং বিচার নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা—দুটিই অপরাধ দমনের মূল ভিত্তি।
বিচারব্যবস্থাকে দ্রুত করতে গিয়ে অবশ্যই ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতি ক্ষুণ্ন করা যাবে না। তবে অযথা বিলম্ব, তদন্তে অবহেলা এবং প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপের সুযোগ কমাতে হবে।
প্রতিটি অভিযোগের ক্ষেত্রে পেশাদার তদন্ত, প্রমাণ সংরক্ষণ, ফরেনসিক সক্ষমতা এবং ভুক্তভোগীবান্ধব প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অপরাধী যে পরিচয়েরই হোক—রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক কিংবা পারিবারিক—আইনের সামনে তার পরিচয় যেন কোনো বিশেষ সুবিধার কারণ না হয়।
আইনের চোখে সমতা কেবল সংবিধানের ভাষা নয়; এটি মানুষের নিরাপত্তার বাস্তব শর্ত।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয় যখন অপরাধ ঘটার পর রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিক্রিয়া দুর্বল, বিলম্বিত বা পক্ষপাতদুষ্ট হয়।
তখন একটি অপরাধ শুধু একজন ভুক্তভোগীকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না। সম্ভাব্য অপরাধীদেরও ভুল বার্তা দেয়। তারা মনে করতে পারে, অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব।
বিপরীতে, দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃশ্যমান বিচার সমাজে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধমূলক বার্তা তৈরি করে। তাই নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় তদন্ত শেষ করার জন্য কার্যকর সময়সীমা এবং মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা প্রয়োজন।
সাক্ষী সুরক্ষা এবং বিশেষায়িত প্রসিকিউশন ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করা দরকার। বিচারক, পুলিশ, চিকিৎসক, আইনজীবী এবং সমাজকর্মীদের প্রশিক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ ভুক্তভোগীর সঙ্গে প্রথম যোগাযোগের সময় সংবেদনশীল আচরণ না হলে সে দ্বিতীয়বার মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হতে পারে।
বিচার শুধু আদালতের রায় নয়। অভিযোগ গ্রহণ থেকে শুরু করে চিকিৎসা, তদন্ত, সাক্ষ্য, নিরাপত্তা, ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের পুরো প্রক্রিয়াই ন্যায়বিচারের অংশ।
নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় অপরাধীর সামাজিক বা রাজনৈতিক পরিচয় অনেক সময় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। কোনো পরিবার যদি প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ করে, তারা প্রতিশোধ, সামাজিক বয়কট, অর্থনৈতিক ক্ষতি বা রাজনৈতিক চাপের ভয় পেতে পারে।
এই ভয় দূর করার জন্য শুধু পুলিশের উপস্থিতি যথেষ্ট নয়। সাক্ষী ও ভুক্তভোগী সুরক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করতে হবে যে নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত কাউকে দলীয় পরিচয় বা ক্ষমতার কারণে আশ্রয় দেওয়া হবে না।
দলীয় শৃঙ্খলা এবং আইনগত প্রক্রিয়া—দুটিকে পাশাপাশি চলতে হবে। সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জন্য আলাদা আইন আর সাধারণ মানুষের জন্য আলাদা আইন—এমন ধারণা তৈরি হলে আইনের প্রতি আস্থা ভেঙে পড়ে।
রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি হওয়া উচিত:
ক্ষমতা কাউকে অপরাধের লাইসেন্স দেয় না।
প্রযুক্তি নারী ও শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রে একই সঙ্গে আশীর্বাদ এবং ঝুঁকি। একটি নির্যাতনের ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে জনমত তৈরি হতে পারে এবং তদন্তের দাবি জোরালো হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সাধারণ মানুষের কণ্ঠকে শক্তিশালী করেছে। আগে চাপা পড়ে যাওয়া অনেক ঘটনাও এখন দ্রুত প্রকাশ্যে আসে।
কিন্তু একই প্রযুক্তি ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ, ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়া, গুজব তৈরি, অনলাইন হুমকি এবং যৌন হয়রানির অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহার করা হচ্ছে।
বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহজলভ্যতার কারণে ভুয়া বা বিকৃত ছবি-ভিডিও তৈরি করে কাউকে অপমান করার ঝুঁকি বেড়েছে।
তাই ডিজিটাল নিরাপত্তাকে নারী ও শিশু সুরক্ষা নীতির বাইরে রাখার কোনো সুযোগ নেই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিবাচক শক্তিকে কাজে লাগাতে হলে দায়িত্বশীল নাগরিক সাংবাদিকতা, সচেতনতা এবং দ্রুত তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
কোনো নির্যাতনের ভিডিও দেখলে সেটি বারবার শেয়ার না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তথ্য দেওয়া অনেক বেশি কার্যকর। ভুক্তভোগীর মুখ, নাম, ঠিকানা, স্কুল, পরিবারের পরিচয় বা ব্যক্তিগত ছবি প্রকাশ করা উচিত নয়।
একটি ভাইরাল পোস্ট হয়তো কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু সেই পোস্টের কারণে একজন শিশুর সারাজীবনের সামাজিক নিরাপত্তা নষ্ট হতে পারে।
তাই প্রযুক্তি ব্যবহারের মূল নীতি হওয়া উচিত:
অপরাধ প্রকাশ করুন, ভুক্তভোগীকে প্রকাশ করবেন না।
সাংবাদিক, কনটেন্ট নির্মাতা, শিক্ষক, অভিভাবক এবং সাধারণ ব্যবহারকারী সবাইকে ডিজিটাল নৈতিকতা সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।
প্রযুক্তি যেন ন্যায়বিচারের সহায়ক হয়, নতুন নির্যাতনের মাধ্যম না হয়—এই ভারসাম্য তৈরি করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমন প্রযুক্তি তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে বাস্তব ব্যক্তির মুখ বা কণ্ঠ ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট তৈরি করা সম্ভব।
এর অপব্যবহার নারীদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল এবং মানহানির নতুন পথ খুলে দিতে পারে। প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতার ক্ষেত্রে AI-সম্পর্কিত ঝুঁকি তাই গুরুত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করা প্রয়োজন।
ডিজিটাল অপরাধ মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়াতে হবে। শুধু আইন করলেই হবে না; ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ, অপরাধী শনাক্তকরণ এবং ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা রক্ষার সক্ষমতা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। অভিযোগ ব্যবস্থাকে কার্যকর করা, ক্ষতিকর কনটেন্ট দ্রুত পর্যালোচনা করা এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
অনলাইন জগৎ বাস্তব জগতের বাইরে কোনো আলাদা পৃথিবী নয়। অনলাইনের হুমকি অনেক সময় বাস্তব জীবনের ভয়, হয়রানি ও সহিংসতায় রূপ নিতে পারে।
নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান শুরু হয় পরিবার থেকে। শিশুকে শুধু ভালো ফলাফল, চাকরি বা অর্থনৈতিক সাফল্যের জন্য প্রস্তুত করলে হবে না।
তাকে সম্মান, সহমর্মিতা, সম্মতি, সমতা এবং দায়িত্ববোধ শেখাতে হবে। ছেলে শিশুকে বোঝাতে হবে যে শক্তিশালী হওয়া মানে অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়।
মেয়েশিশুকে বোঝাতে হবে যে তার শরীর, মতামত এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রয়েছে।
একইভাবে, শিক্ষককে বুঝতে হবে যে শাসনের নামে অপমান বা শারীরিক আঘাত কোনো শিক্ষণপদ্ধতি নয়। স্কুলে শিশু সুরক্ষা নীতি, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষিত দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি থাকা দরকার।
অভিভাবকদেরও শিশুর আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, অতিরিক্ত ভয়, স্কুলে যেতে অনীহা বা নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে এড়িয়ে চলার মতো সংকেতকে গুরুত্ব দিতে হবে।
শিশুকে এমন পরিবেশ দিতে হবে যেখানে সে জানবে—কোনো ঘটনা বললে তাকে দোষ দেওয়া হবে না।
বিশ্বাসের সম্পর্কই শিশু সুরক্ষার প্রথম দেয়াল।
নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে নৈতিক শিক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়। এটি অপরাধ প্রতিরোধের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।
ছোটবেলা থেকেই শিশুদের শেখাতে হবে যে কাউকে তার লিঙ্গ, বয়স, পোশাক, আর্থিক অবস্থা বা সামাজিক পরিচয়ের কারণে ছোট করা যায় না।
স্কুলের পাঠ্যক্রমে নিরাপদ স্পর্শ, অনিরাপদ স্পর্শ, সম্মতি, ব্যক্তিগত সীমানা, অনলাইন নিরাপত্তা এবং সহায়তা চাওয়ার পদ্ধতি বয়সোপযোগীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
ছেলেদের জন্য যেমন সম্মান ও আত্মনিয়ন্ত্রণের শিক্ষা দরকার, মেয়েদের জন্য তেমনি আত্মবিশ্বাস ও অধিকার সম্পর্কে জ্ঞান প্রয়োজন।
তবে দায়িত্ব শুধু মেয়েদের “সাবধানে চলার” শিক্ষা দিয়ে শেষ করা যাবে না। পুরুষ ও ছেলেদের আচরণ পরিবর্তনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একটি সমাজে নারীকে নিরাপদ থাকতে প্রতিনিয়ত সতর্ক থাকতে হবে, অথচ অপরাধীকে আচরণ পরিবর্তনের শিক্ষা দেওয়া হবে না—এটি কোনো টেকসই সমাধান নয়।
নিরাপত্তার দায়িত্ব নারী ও শিশুর ওপর চাপিয়ে না দিয়ে সমাজের প্রতিটি স্তরে দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হবে।
রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব হলো নাগরিকের জীবন, মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষা করা। নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশকে দ্রুত ও সংবেদনশীলভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে।
তদন্ত কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ, ফরেনসিক সুবিধা, ডিজিটাল প্রমাণ বিশ্লেষণ এবং শিশু-বান্ধব সাক্ষ্যগ্রহণ পদ্ধতি শক্তিশালী করা জরুরি।
পাশাপাশি হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় প্রমাণ সংরক্ষণ এবং ভুক্তভোগীবান্ধব চিকিৎসা নিশ্চিত করার প্রোটোকল কার্যকর থাকা দরকার।
রাষ্ট্র চাইলে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলোর জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করতে পারে। এতে মামলা কোন পর্যায়ে আছে তা দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ পর্যবেক্ষণ করতে পারবে।
এতে প্রশাসনিক জট কমতে পারে এবং দীর্ঘদিন মামলা পড়ে থাকার ঝুঁকিও কমবে।
লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু “মামলা হয়েছে” বলা নয়। অভিযোগ থেকে বিচার পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপের জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
দ্রুত বিচার মানে তাড়াহুড়ো করে বিচার নয়। এর অর্থ হলো অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব দূর করে ন্যায়সঙ্গত প্রক্রিয়াকে কার্যকর করা।
তদন্তে দেরি হলে প্রমাণ নষ্ট হতে পারে, সাক্ষী প্রভাবিত হতে পারে এবং ভুক্তভোগীর পরিবার মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়তে পারে।
তাই গুরুতর নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় তদন্তের মান পর্যবেক্ষণ, প্রসিকিউশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সাক্ষী সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার।
বিশেষ ট্রাইব্যুনাল থাকলেই যথেষ্ট নয়। সেখানে পর্যাপ্ত বিচারক, প্রসিকিউটর, কর্মী, ফরেনসিক সহায়তা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা থাকতে হবে।
একই সঙ্গে ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মামলা করার কারণে তারা যেন নতুন হুমকির মুখে না পড়েন, সেটিও রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে।
আদালতের রায় কার্যকর করার ক্ষেত্রেও কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয়।
একটি অপরাধীর শাস্তি শুধু একজনকে দণ্ডিত করে না। এটি সম্ভাব্য অপরাধীদের জন্যও একটি সতর্কবার্তা তৈরি করে।
ন্যায়বিচার শুধু অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন নারী বা শিশু নির্যাতনের পর নিরাপদে বেঁচে থাকতে পারছে কি না, তার চিকিৎসা হয়েছে কি না এবং মানসিক সহায়তা পেয়েছে কি না—এসবও ন্যায়বিচারের অংশ।
শিক্ষা বা কর্মজীবনে ফিরে যেতে পারছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক নারী অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় নির্যাতনমূলক সম্পর্ক থেকে বের হতে পারেন না।
অনেক শিশুর পরিবার মামলা করার পর সামাজিক চাপের মুখে পড়ে। তাই সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নিরাপদ আশ্রয়, আইনি সহায়তা, মনোসামাজিক কাউন্সেলিং এবং পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানো দরকার।
শিশুদের ক্ষেত্রে একটি ডেডিকেটেড শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা আরও কার্যকরভাবে গড়ে তোলা যেতে পারে। সেখানে সমাজকর্মী, পুলিশ, চিকিৎসক, আইনজীবী ও মনোবিজ্ঞানীরা সমন্বিতভাবে কাজ করবেন।
ভুক্তভোগীর সঙ্গে বারবার একই ঘটনার বিবরণ নেওয়ার মতো পুনরায় ট্রমা সৃষ্টি করে এমন প্রক্রিয়াও কমাতে হবে।
রাষ্ট্র যদি ভুক্তভোগীকে বলে—“তুমি একা নও, আমরা তোমার পাশে আছি”—তাহলে সেই বার্তা কেবল একজন মানুষকে নয়, পুরো সমাজকে সাহস দেয়।
নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান স্পষ্ট হওয়া দরকার। দলীয় পরিচয়, ক্ষমতা বা জনপ্রিয়তার কারণে কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তি যেন সামাজিক বা রাজনৈতিক আশ্রয় না পান।
রাজনৈতিক বিরোধের সময় নারী ও শিশুদের ব্যবহার, ভয় দেখানো, অপমান বা সহিংসতার শিকার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
একইভাবে গণপিটুনি, প্রকাশ্যে অপমান বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচার করার প্রবণতাও বন্ধ করতে হবে। আইনের শাসনের বিকল্প “তাৎক্ষণিক জনতার বিচার” হতে পারে না।
একটি গণতান্ত্রিক সমাজে অপরাধের বিচার আদালত করবে, জনতা নয়।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি সত্যিই নারী ও শিশু সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়, তাহলে তাদের নিজেদের সংগঠন, কর্মী এবং সমর্থকদের আচরণের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রয়োগ করতে হবে।
শূন্য-সহনশীলতা শুধু বক্তৃতার শব্দ নয়। এটি অপরাধীর পরিচয় নির্বিশেষে একই নিয়ম প্রয়োগের রাজনৈতিক অঙ্গীকার।
গণমাধ্যম সমাজের আয়না। কিন্তু আয়না যদি আহত মানুষের মুখ আরও বিকৃত করে দেখায়, তাহলে সেটি আর দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা থাকে না।
নারী ও শিশু নির্যাতনের সংবাদ প্রকাশের সময় ভুক্তভোগীর পরিচয়, ছবি, ঠিকানা, স্কুল বা এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়, যা তার নিরাপত্তা বা ভবিষ্যৎকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
অপরাধের বিবরণ দিতে গিয়ে অপ্রয়োজনীয়ভাবে সংবেদনশীল ছবি বা ভিডিও প্রচার করাও অনুচিত।
সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত অপরাধকে দৃশ্যমান করা, ভুক্তভোগীকে প্রদর্শন করা নয়।
একই সঙ্গে গণমাধ্যমকে শুধু ঘটনার নাটকীয়তা নয়, বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি, তদন্তের মান এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির দিকেও নজর দিতে হবে।
কোনো ঘটনা ভাইরাল হওয়ার পর কয়েকদিন আলোচনা করে থেমে গেলে পরিবর্তন আসে না। মামলার শেষ পর্যন্ত অনুসরণমূলক সাংবাদিকতা প্রয়োজন।
দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশন জনসচেতনতা বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জবাবদিহির চাপও তৈরি করতে পারে।
একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে হলে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন।
পরিবার শিশুদের নিরাপত্তা ও মূল্যবোধ শেখাবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করবে। পুলিশ দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত করবে।
আদালত অযথা বিলম্ব কমাবে। রাজনৈতিক দল অপরাধীকে আশ্রয় দেবে না। গণমাধ্যম ভুক্তভোগীর মর্যাদা রক্ষা করবে এবং নাগরিক সমাজ নজরদারি ও সহায়তার ভূমিকা পালন করবে।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ডিজিটাল সহিংসতা মোকাবিলায় দায়িত্ব নিতে হবে। নারী ও শিশুদের জন্য সহজে পৌঁছানো যায় এমন অভিযোগ ব্যবস্থা, আইনি সহায়তা এবং জরুরি সুরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে সচেতনতা তৈরির সময় শুধু ভয় ছড়ানোর বদলে করণীয় জানানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মানুষকে জানতে হবে কোথায় অভিযোগ করতে হবে, কীভাবে প্রমাণ সংরক্ষণ করতে হবে এবং ভুক্তভোগীকে কীভাবে সহায়তা করতে হবে।
সচেতনতা যদি বাস্তব পদক্ষেপের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং আইন যদি নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ হয়, তাহলে ধীরে ধীরে অপরাধের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা কমানো সম্ভব।
শুধু কঠোর আইন দিয়ে সমাজের মূল্যবোধ পরিবর্তন করা যায় না। আবার শুধু সচেতনতা দিয়েও অপরাধীকে থামানো যায় না।
সচেতনতা হলো প্রতিরোধের ভিত্তি এবং কার্যকর আইন হলো জবাবদিহির শক্তি।
দুটির একটি অনুপস্থিত থাকলে ব্যবস্থাটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সমাজকে এমন জায়গায় যেতে হবে যেখানে শিশুকে মারধর করাকে “শাসন” বলা হবে না।
স্ত্রীর ওপর সহিংসতাকে “পারিবারিক ব্যাপার” বলা হবে না। যৌন হয়রানিকে “মজা” বলা হবে না। ভুক্তভোগীকে প্রশ্ন করে অপরাধীর দায় কমানোর চেষ্টাও করা হবে না।
অপরাধীকে রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে লুকানোর সুযোগ বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি, নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
আজ যে শিশুটি অন্যায়ের শিকার হচ্ছে, সে আমাদেরই সমাজের ভবিষ্যৎ নাগরিক। আজ যে নারী নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, তার নিরাপত্তা আসলে আমাদের সবার নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত।
তাই নারী ও শিশুর নিরাপত্তাকে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর দাবি হিসেবে নয়, রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব এবং সমাজের নৈতিক কর্তব্য হিসেবে দেখতে হবে।
একটি সভ্য সমাজের পরিচয় তার অট্টালিকার উচ্চতা, প্রযুক্তির গতি কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিমাণ দিয়ে নির্ধারিত হয় না। বরং নির্ধারিত হয় সেখানে সবচেয়ে দুর্বল মানুষটি কতটা নিরাপদ এবং ন্যায়বিচার কতটা নিশ্চিত—তার ওপর।
নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াই তাই কেবল পুলিশ, আদালত বা সরকারের দায়িত্ব নয়। এটি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সমাজ, গণমাধ্যম, নাগরিক সংগঠন, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব।
২০২৬ সালের সাম্প্রতিক তথ্যগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে যে সমস্যাটিকে আর অবহেলা করার সুযোগ নেই। HRSS-এর হিসাবে বছরের প্রথম ছয় মাসে নারী ও কিশোরীদের ওপর সহিংসতার ঘটনা আগের বছরের তুলনায় ৫৬ শতাংশ বেড়েছে। ASK-এর তথ্যও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ভয়াবহ পরিণতি তুলে ধরেছে।
এখন প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে অভিযোগ করলে ভুক্তভোগী ভয় পাবেন না। তদন্তে প্রভাব খাটবে না, সাক্ষী নিরাপদ থাকবেন এবং বিচার অযথা বিলম্বিত হবে না।
অপরাধী তার পরিচয় দিয়ে পার পাওয়ার সুযোগ পাবে না। একই সঙ্গে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শিশুদের মানবিকতা, সহমর্মিতা, সম্মান, সম্মতি ও সমতার শিক্ষা দিতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে গুজব ও ভুক্তভোগী হেনস্তার জায়গা না বানিয়ে ন্যায়বিচার ও সচেতনতার শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
নীরবতা অপরাধকে শক্তিশালী করে; সচেতনতা, প্রতিবাদ এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ তৈরি করে।
আমাদের লক্ষ্য এমন বাংলাদেশ হওয়া উচিত, যেখানে নারী ঘরে ও বাইরে মর্যাদার সঙ্গে চলতে পারবেন এবং শিশুরা ভয়হীন পরিবেশে বড় হবে।
কোনো অপরাধী যেন না ভাবে যে ক্ষমতা, পরিচয় বা সামাজিক প্রভাব তাকে আইনের হাত থেকে রক্ষা করবে। এই পরিবর্তন একদিনে আসবে না।
তবে প্রতিটি সচেতন পরিবার, প্রতিটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিটি ন্যায়ভিত্তিক পদক্ষেপ সেই পরিবর্তনের দিকে একটি করে শক্তিশালী পাথর স্থাপন করবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো সচেতনতা ও আইনের কার্যকর বাস্তবায়নকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া।
পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মূল্যবোধ ও অধিকার সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে। পাশাপাশি অভিযোগের দ্রুত তদন্ত, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা এবং অপরাধীর নিশ্চিত জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
শুধু আইন প্রণয়ন বা শুধু প্রচারাভিযান—কোনোটিই একা যথেষ্ট নয়।
বিচারহীনতা কমাতে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, মানসম্মত প্রসিকিউশন, সাক্ষী সুরক্ষা, ফরেনসিক সক্ষমতা এবং আদালতের কার্যকর সময় ব্যবস্থাপনা দরকার।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অপরাধীর সামাজিক বা রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে একই আইনি মানদণ্ড প্রয়োগ করা। বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য কার্যকর জবাবদিহি ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
পরিবারকে নির্যাতনকে “পারিবারিক ব্যাপার” বলে লুকিয়ে না রেখে ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়াতে হবে।
শিশুদের সঙ্গে বিশ্বাসভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা ভয় ছাড়াই কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা জানাতে পারে।
একই সঙ্গে ছেলে ও মেয়ে উভয় শিশুকেই সম্মান, সমতা, ব্যক্তিগত সীমা এবং দায়িত্বশীল আচরণ শেখানো জরুরি।
প্রথমত, ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ করা বা সংবেদনশীল ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
যাচাই না করে গুজব ছড়ানো উচিত নয়। সম্ভব হলে প্রাসঙ্গিক তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষকে দেওয়া এবং ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা রক্ষা করা উচিত।
সাধারণ নাগরিকের সবচেয়ে বড় ভূমিকা হলো অন্যায় দেখেও নীরব না থাকা এবং নিরাপদ ও দায়িত্বশীল উপায়ে সহায়তা করা।
ভুক্তভোগীকে দোষারোপ না করে তার কথা শোনা, প্রয়োজনীয় সহায়তার পথ দেখানো এবং অপরাধীকে সামাজিকভাবে প্রশ্রয় না দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ছোট ছোট দায়িত্বশীল আচরণই শেষ পর্যন্ত একটি বড় সামাজিক পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
আরও পড়ুন নবনিযুক্ত স্থানীয় সরকার,পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর সাথে রাসিক প্রশাসকের সৌজন্য সাক্ষাৎ
Follow us on Facebook
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: রোকনুজ্জামান রোকন নির্বাহী সম্পাদক: ইফতেখার আলম সম্পাদক কর্তৃক উত্তর নওদাপাড়া, পো: সপুরা, রাজশাহী-৬২০৩ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল: ০১৭১১-২০৮ ১৭২, ০১৮৩৪-৮৬১ ০০৭ ইমেইল: dainiksobujnagar@gmail.com
Copyright © 2025 দৈনিক সবুজ নগর