_____ ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: ব্যক্তির পরিচয় কেবল তার অবয়বে নয়, বরং তার নামে এবং সেই নামের সার্থকতা তার কর্মে। নাম হলো একটি বীজের মতো, যা ব্যক্তির চরিত্রে মহীরুহ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা জাগিয়ে রাখে। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব ও সমাজবাস্তবতায় নামের এই দার্শনিক গুরুত্ব চরম অবক্ষয়ের সম্মুখীন। একদিকে যেমন অর্থের বিকৃতি ঘটিয়ে কদর্য নামকরণ করা হচ্ছে, অন্যদিকে নামের সাথে কর্মের আকাশ-পাতাল ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। এই সংকটটি কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং এর শিকড় সমাজ, রাষ্ট্র এবং ধর্মের গভীরে প্রোথিত।
১. ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ: নাম একটি আমানত ধর্মীয় বিধিবিধানে নামকরণকে কেবল একটি লৌকিকতা নয়, বরং একটি ইবাদত ও দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়।
অর্থের গুরুত্ব: ইসলাম ধর্মে বলা হয়েছে, "কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে তোমাদের নাম ও তোমাদের পিতার নামে ডাকা হবে, তাই তোমাদের নামগুলো সুন্দর রাখো" (আবু দাউদ)। সুন্দর নাম মানে কেবল শ্রুতিমধুর শব্দ নয়, বরং যার অর্থ ইতিবাচক। নামের অপব্যবহার ও গুনাহ: পবিত্র কুরআনের কোনো আয়াত বা শব্দের অপপ্রয়োগ করে নাম রাখা (যেমন—তুকাজজিবান বা অলাদুল খিঞ্জির জাতীয় শব্দ) কেবল অজ্ঞতা নয়, বরং ধর্মীয় অবমাননার শামিল।
চরিত্রের সাথে নামের দাবি: ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে, যদি কারও নাম 'ফজর' বা 'রমজান' রাখা হয়, তবে সেই নামের একটি আধ্যাত্মিক ভার বা 'আমানত' তার ওপর অর্পিত হয়। সেই নামের অমর্যাদা করা বা নামের বিপরীত জীবনযাপন করাকে এক ধরণের চারিত্রিক মুনাফিকি হিসেবে দেখা হয়।
২. সামাজিক দৃষ্টিকোণ: ভণ্ডামি ও পরিচয়ের সংকট সামাজিকভাবে নাম এবং পদবি মানুষের আস্থার প্রতীক। যখন এই প্রতীকের অপব্যবহার হয়, তখন সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।
স্বঘোষিত আভিজাত্য: আমাদের সমাজে ডিগ্রিহীন 'ডাক্তার' বা বারান্দা দিয়ে হাঁটা 'অধ্যাপক'-এর যে বিড়ম্বনা, তা আসলে সস্তা আভিজাত্য লাভের আকাঙ্ক্ষা। এটি প্রকৃত পেশাজীবীদের জন্য অমর্যাদাকর এবং সাধারণ মানুষের জন্য বিভ্রান্তিকর।
ভুল নামকরণের সামাজিক গ্লানি: অর্থ না জেনে রাখা কুৎসিত নামের কারণে অনেক শিশুকে স্কুলে বা কর্মক্ষেত্রে বুলিং (Bullying) বা উপহাসের শিকার হতে হয়। এটি ব্যক্তির মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং হীনম্মন্যতা তৈরি করে।
বিপরীতমুখী চরিত্র: যখন সমাজের চোর বা দুর্নীতিবাজের নাম হয় 'সাদিক' (সত্যবাদী) বা 'আমীন' (বিশ্বস্ত), তখন সামাজিক মূল্যবোধের পরিহাস ফুটে ওঠে। এটি সমাজকে বার্তা দেয় যে, নাম কেবল একটি মুখোশ।
৩. রাষ্ট্রীয় ও আইনি দৃষ্টিকোণ: সনদ ও স্বচ্ছতা রাষ্ট্রের কাছে নাম এবং পদবি হলো তার নাগরিকের আইনি স্বীকৃতি। এখানে বিশৃঙ্খলা মানেই রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়া।
পদবির জালিয়াতি: আইনগতভাবে কোনো স্বীকৃত ডিগ্রি ছাড়া 'ডাক্তার', 'ইঞ্জিনিয়ার' বা 'অ্যাডভোকেট' পদবি ব্যবহার করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এটি কেবল নৈতিক স্খলন নয়, বরং রাষ্ট্রীয় আইনের লঙ্ঘন। ভুয়া পরিচিতি ও
নিরাপত্তা ঝুঁকি: নামের সাথে যখন কর্মের বা যোগ্যতার মিল থাকে না এবং মানুষ যখন ভুয়া পরিচয়ে মাওলানা বা বিশেষজ্ঞ সেজে প্রভাব বিস্তার করে, তখন রাষ্ট্রের জননিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ে।
রাষ্ট্রীয় সংস্কার: উন্নত অনেক রাষ্ট্রে নামকরণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে যাতে আপত্তিকর বা অর্থহীন নাম রাখা না যায়। আমাদের দেশেও জন্মনিবন্ধনের সময় নামের অর্থ যাচাইয়ের একটি পরোক্ষ ব্যবস্থা থাকা জরুরি। বর্তমান সংকটের মূল কারণসমূহ
১. ভাষাগত অজ্ঞতা: বিশেষ করে আরবি ও ফারসি শব্দের সঠিক ব্যুৎপত্তি না জেনে নামকরণ।
২. শো-অফ বা লোকদেখানো মানসিকতা: নিজের নামের সাথে বড় কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক তকমা লাগিয়ে দ্রুত সম্মান পাওয়ার চেষ্টা।
৩. যথাযথ পরামর্শের অভাব: নামকরণের সময় পণ্ডিত বা আলেমদের পরিবর্তে কেবল ইন্টারনেটের অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর নির্ভর করা। উত্তরণের পথ ও উপসংহার নামের এই বৈপরীত্য দূর করতে হলে পরিবার থেকেই সচেতনতা শুরু করতে হবে। শিশুদের কেবল একটি সুন্দর নাম দিলেই হবে না, বরং সেই নামের অর্থের মহিমা তাদের চরিত্রে ফুটিয়ে তোলার শিক্ষা দিতে হবে। পরিশেষে, রাষ্ট্রকে ভুয়া পদবিধারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে এবং সমাজকে নামের চেয়ে কর্মের মূল্যায়ন করতে শিখতে হবে। নাম যেন কেবল লিপিবব্ধ কোনো শব্দ না হয়, বরং তা যেন হয় ব্যক্তির সততা ও যোগ্যতার জীবন্ত বিজ্ঞাপন। নামের সার্থকতা তখনই আসবে যখন 'ফজর আলী'র ভোরে ঘুম ভাঙবে ইবাদতে, আর 'ডাক্তার' পদবিধারী ব্যক্তিটি হবে সেবার মূর্ত প্রতীক!#
... কেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: রোকনুজ্জামান রোকন নির্বাহী সম্পাদক: ইফতেখার আলম সম্পাদক কর্তৃক উত্তর নওদাপাড়া, পো: সপুরা, রাজশাহী-৬২০৩ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল: ০১৭১১-২০৮ ১৭২, ০১৮৩৪-৮৬১ ০০৭ ইমেইল: dainiksobujnagar@gmail.com
Copyright © 2025 দৈনিক সবুজ নগর