
সাব্বির আলম বাবু, ভোলা প্রতিনিধি: দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় নোনা জলের আগ্রাসন এখন নদী পেরিয়ে ভূগর্ভস্থ গভীর নলকূপে হানা দিয়েছে। একসময় যে পানি ছিল এই অঞ্চলের মানুষের জীবনধারণের মূল উৎস, অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে সেই পানিই এখন জনস্বাস্থ্যে বয়ে আনছে নীরব মহামারী। একই সঙ্গে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে কৃষিজমির লবণাক্ততা এবং কমছে ফসল উৎপাদন—যা পুরো উপকূলের জনজীবন, কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয়ের সাম্প্রতিক গবেষণায় দক্ষিণাঞ্চলের নদ-নদী ও ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধির আশঙ্কাজনক চিত্র উঠে এসেছে:
তেঁতুলিয়া নদী (গলাচিপা, পটুয়াখালী): ২০২১ সালের মার্চে পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা ছিল ০.৮৭ ডিসি/এম (ডেসিসিমেন পার মিটার), যা ২০২৬ সালের মার্চে বেড়ে দাঁড়ায় ১.৭৫ ডিসি/এমে।
বলেশ্বর নদ (পাথরঘাটা, বরগুনা): ২০২১ সালের এপ্রিলে লবণাক্ততা ছিল ৪.৫৬ ডিসি/এম, যা ২০২৫ সালের এপ্রিলে বেড়ে হয়েছে ৫.৮৮ ডিসি/এম।
পায়রা নদী (বরগুনা): একই সময়ে এই নদীর লবণাক্ততা ১.৮০ থেকে বেড়ে ৩.৯০ ডিসি/এমে পৌঁছায়।
মেঘনা নদী (বোরহানউদ্দিন, ভোলা): ২০২২ সালের এপ্রিলে লবণাক্ততার মাত্রা ছিল ০.৮৬ ডিসি/এম, যা ২০২৪ সালের এপ্রিলে অস্বাভাবিক বেড়ে ২৫.৩১ ডিসি/এমে পৌঁছায়। এই নোনা প্রভাব উজানের প্রায় ৭০ থেকে ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
(ব্যতিক্রম হিসেবে পটুয়াখালীর আন্ধারমানিক নদে ২০২১ সালের মার্চে লবণাক্ততা ২২.২০ ডিসি/এম থাকলেও ২০২৬ সালের একই সময়ে তা কমে ১৫.২১ ডিসি/এমে নেমে এসেছে।)
গবেষকরা সতর্ক করে জানান, নদ-নদীর এই লবণাক্ততা এখন মাটির নিচে গভীর নলকূপের পানিতেও মিশে যাচ্ছে, যা খাবার পানির চরম সংকট তৈরি করেছে।
দীর্ঘদিন অতিরিক্ত লবণযুক্ত পানি পান ও ব্যবহারের ফলে উপকূলীয় অধিবাসীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, কিডনির জটিলতা ও চর্মরোগের হার ব্যাপক বেড়েছে। বিশেষ করে উপকূলীয় নারীদের স্বাস্থ্য চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে:
জরায়ু ও প্রজনন স্বাস্থ্যঝুঁকি: অতিরিক্ত নোনা পানি ব্যবহারের ফলে নারীদের প্রজননতন্ত্রের সংক্রমণ (Infection) এবং স্বাভাবিক মাসিক চক্র ব্যাহত হচ্ছে।
গর্ভকালীন সংকট: গর্ভবতী নারীদের উচ্চ রক্তচাপ ও জটিলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সচেতনতার অভাব: সমাজকর্মী ও চিকিৎসকদের মতে, অনেকে মনে করেন শুধু খাওয়ার জন্যই মিষ্টি পানি দরকার। কিন্তু গোসল ও গৃহস্থালির কাজে নোনা পানি ব্যবহারের ফলে চর্মরোগ ও জরায়ুর ইনফেকশন বাড়ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগের মোট ৮ লাখ ২ হাজার হেক্টর চাষযোগ্য জমির মধ্যে ৪ লাখ ১৫ হাজার হেক্টর বা ৫২ শতাংশ জমিই এখন লবণাক্ততায় আক্রান্ত।
পটুয়াখালী: ৩৯% জমি আক্রান্ত (সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত)
বরগুনা ও ভোলা: ২৪% জমি
পিরোজপুর: ৯% জমি
বরিশাল: ৩% জমি
ঝালকাঠি: ১% জমি
পটুয়াখালীর লেবুখালীর আঞ্চলিক উদ্যান তত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আলিমুর রহমান জানান, আগে কেবল উপকূলীয় জেলাগুলোতে নোনার প্রভাব থাকলেও গত দুই বছর ধরে বরিশালের মূল ভূখণ্ডের মাটি ও পানিতেও লবণাক্ততার উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে।
সুপেয় পানির সংকট দ্রুত সমাধান করা না গেলে দক্ষিণাঞ্চলে জীবিকা ও স্বাস্থ্যের সংকট আরও গভীর হবে। বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন:
বিকল্প সুপেয় পানির বন্দোবস্ত: রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং (বৃষ্টির পানি ধরে রাখা) ও ডেসালিনেশন প্ল্যান্ট স্থাপন।
নোনা পানির প্রবেশ রোধ: টেকসই বেড়িবাঁধ ও নদী সংস্কারের মাধ্যমে উজানে নোনা পানির অনুপ্রবেশ ঠেকানো।
স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি: রান্নাবান্না ও শৌচকর্মেও পরিষ্কার পানি ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো।
লবণসহিষ্ণু ফসলের উদ্ভাবন: কৃষকদের কাছে দ্রুত লবণসহিষ্ণু জাতের বীজ পৌঁছানো।#
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: রোকনুজ্জামান রোকন নির্বাহী সম্পাদক: ইফতেখার আলম সম্পাদক কর্তৃক উত্তর নওদাপাড়া, পো: সপুরা, রাজশাহী-৬২০৩ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল: ০১৭১১-২০৮ ১৭২, ০১৮৩৪-৮৬১ ০০৭ ইমেইল: dainiksobujnagar@gmail.com
Copyright © 2025 দৈনিক সবুজ নগর