
ক্যাপশন: মাছ নয়, বস্তা ভর্তি শামুক
হামিদুর রহমান, তানোর (রাজশাহী): এক সময় মাছের প্রাচুর্যে ভরপুর ছিল রাজশাহীর তানোর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিব নদী। নদীর পানি ও মাছকে ঘিরেই জীবিকা নির্বাহ করতেন স্থানীয় অসংখ্য মৎস্যজীবী। ভোর থেকে নদীতে জাল ফেললেই মিলত বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ, আর সেই মাছ বিক্রির আয়েই সুন্দরভাবে চলত তাদের সংসার।
তবে সময়ের ব্যবধানে বদলে গেছে শিব নদীর সেই পরিচিত চিত্র। নদীর নাব্য হ্রাস, পানি শুকিয়ে যাওয়া, বিভিন্ন অংশে অবৈধ দখল ও পরিবেশগত নানা সমস্যার কারণে মারাত্মকভাবে কমেছে মাছের উৎপাদন। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নদীনির্ভর শত শত মৎস্যজীবী পরিবার। নদীতে মাছ না পেয়ে এখন জীবিকার তাগিদে বাধ্য হয়ে নদী ও আশপাশের বিল থেকে শামুক সংগ্রহ করে বিক্রি করছেন তারা।
তানোর পৌর সদরের কুটিপাড়া গ্রামের মৎস্যজীবী আজাহার আলী জানান, মাছ ধরেই দীর্ঘদিন ধরে তার সংসার চলেছে। কিন্তু নদীতে এখন আগের মতো পানি ও মাছ না থাকায় জাল ফেলে আর তেমন মাছ পাওয়া যায় না। পরিবার বাঁচাতে বাধ্য হয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিল ও নদীর বিভিন্ন স্থান থেকে শামুক কুড়াচ্ছেন তিনি।
মৎস্যজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তীব্র রোদে সারাদিন পরিশ্রম করে এক বস্তা শামুক সংগ্রহ করলে মেলে মাত্র ৪০ টাকা। এই সামান্য আয় দিয়েই কোনো রকমে ডাল-ভাত খেয়ে দিন পার করছেন তারা।
স্থানীয় মৎস্যজীবী রমজান ও হাসেম বলেন, "সংগৃহীত শামুকগুলো স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হয়, যা হাঁসের খাদ্যসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়। মাছ থাকলে আমরা কখনোই শামুক কুড়াতে যেতাম না। কিন্তু পেটের দায়ে এই সামান্য টাকায় দিনমজুরি করতে হচ্ছে।"

আক্ষেপ প্রকাশ করে মৎস্যজীবী আশরাফুল বলেন, "নদীতে এখন আর আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। পেটের দায়ে শামুক মেরে বিক্রি করতে হচ্ছে। আগে নদীতে মাছ ধরে ভালোভাবেই সংসার চলত। এখন সারাদিন জাল ফেলে বসে থাকলেও হাত খালি থাকে। সরকার যদি নদী খনন করে এবং মাছের অভয়াশ্রম তৈরি করে দেয়, তাহলে আমরা আবার মাছ ধরে স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে পারব।"
স্থানীয় মৎস্যজীবীদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে নদীতে পানি না থাকায় মাছের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। এতে করে নদীর ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো দিন দিন আরও অসহায় হয়ে পড়ছে। অনেকেই বিকল্প পেশায় যেতে চাইলেও কোনো কাজের সুযোগ না থাকায় শেষ পর্যন্ত এই নদী ও বিলের ওপরই পড়ে থাকতে হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে শিব নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনতে দ্রুত খনন, অবৈধ দখল মুক্তকরণ, নদীর পরিবেশ রক্ষা এবং মাছের অভয়াশ্রম গড়ে তোলার জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী মৎস্যজীবীরা। একই সঙ্গে নদী ও বিলের বর্তমান পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাঈমা খানের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন তারা।
মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর উদ্যোগ নিলে একদিকে যেমন শিব নদীর হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ও পরিবেশ ফিরে আসবে, অন্যদিকে নদীনির্ভর শত শত পরিবারের জীবিকায় ফিরবে স্বস্তি।#
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: রোকনুজ্জামান রোকন নির্বাহী সম্পাদক: ইফতেখার আলম সম্পাদক কর্তৃক উত্তর নওদাপাড়া, পো: সপুরা, রাজশাহী-৬২০৩ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল: ০১৭১১-২০৮ ১৭২, ০১৮৩৪-৮৬১ ০০৭ ইমেইল: dainiksobujnagar@gmail.com
Copyright © 2025 দৈনিক সবুজ নগর