# হামিদুর রহমান, তানোর, রাজশাহী প্রতিনিধি: রাজশাহীর তানোর উপজেলার কামারগাঁ খাদ্যগুদামে চলতি বোরো মৌসুমে সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ধান সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কয়েকটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। এমনকি সরকারি বরাদ্দের একটি অংশ অন্য একটি সিন্ডিকেটের কাছে অর্থের বিনিময়ে হস্তান্তর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কৃষকরা। এ ঘটনায় স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। শনিবার সকালে রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের সংসদ সদস্য কামারগাঁ সফরে গেলে ক্ষুব্ধ কৃষকরা সরাসরি গুদাম কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে দ্রুত তাঁর বদলির দাবি জানান। বিষয়টি একাধিক স্থানীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে।
কৃষকদের অভিযোগ, টাকা ছাড়া ধান নেওয়া হয়নি স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, কামারগাঁ খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আতিকুর রহমান সিন্ডিকেটের মাধ্যমে টাকার বিনিময়ে ধান সংগ্রহ করেছেন। এতে প্রকৃত প্রান্তিক কৃষকরা সরকারি মূল্যে ধান বিক্রির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এবং বাধ্য হয়ে খোলা বাজারে কম দামে ধান বিক্রি করে ব্যাপক লোকসানের শিকার হয়েছেন। তাদের দাবি, সরকারি সিদ্ধান্ত ছিল কৃষকের উৎপাদন খরচ বিবেচনায় নিয়ে ন্যায্যমূল্যে ধান সংগ্রহ করা। কিন্তু বাস্তবে সেই সুবিধা পেয়েছেন ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেট সদস্যরা। ৫৫৫ মেট্রিক টনের বরাদ্দ, অভিযোগ ২০০ মেট্রিক টন অন্যত্র দেওয়া হয়েছে জানা গেছে, কলমা ও কামারগাঁ ইউনিয়নের কৃষকদের কাছ থেকে ৫৫৫ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রতি কেজি ধানের সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৩৬ টাকা এবং নিবন্ধিত প্রত্যেক কৃষক সর্বোচ্চ ৩ মেট্রিক টন ধান সরবরাহ করতে পারতেন। কৃষকদের অভিযোগ, প্রায় ৩৫৫ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের পর অবশিষ্ট প্রায় ২০০ মেট্রিক টন ধানের বরাদ্দ অর্থের বিনিময়ে সেলিম হাজী নামের এক ব্যবসায়ীর সিন্ডিকেটের কাছে দেওয়া হয়। পরে ওই ধান তানোর সদর খাদ্যগুদামে সংগ্রহ করা হয়েছে।অভিযোগ অনুযায়ী, সেলিম হাজী কামারগাঁ ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক এবং অতীতেও খাদ্যগুদামে একচেটিয়া ব্যবসা করেছেন। স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি এখনও একই ধরনের সুবিধা নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। ব্যবসায়ীরা ধান দিয়েছেন, কৃষকরা পারেননি স্থানীয় সূত্রের দাবি, কামারগাঁ বাজারের ব্যবসায়ী শেখ জুয়েল, মতিউর রহমান মতি এবং উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রায়হানসহ কয়েকজন ব্যবসায়ী বিপুল পরিমাণ ধান খাদ্যগুদামে সরবরাহ করেছেন। অথচ প্রকৃত কৃষকদের বড় একটি অংশ ধান দিতে পারেননি। স্থানীয়রা জানান, শেখ জুয়েল বিএডিসির সার ব্যবসায়ী। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির (১৫ টাকা কেজি দরে চাল) ডিলার ছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তিনি খাদ্যগুদামে ধান ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ‘প্রতি টনে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কৃষক অভিযোগ করেন, ধান সংগ্রহের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত ও ধান গ্রহণের জন্য প্রতি টনে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। তাদের ভাষ্য, প্রশাসন তালিকা ধরে তদন্ত করলেই প্রকৃত কৃষকের পরিবর্তে কারা ধান দিয়েছেন এবং কারা সুবিধা নিয়েছেন, তা সহজেই বেরিয়ে আসবে। সরকারি দামে লাভ, কৃষক বঞ্চিত কৃষকদের দাবি, বর্তমানে খোলা বাজারে প্রতি মণ ধানের দাম ৯৫০ থেকে ১ হাজার টাকার মধ্যে। অন্যদিকে সরকার প্রতি কেজি ৩৬ টাকা হিসেবে প্রতি মণ ধানের মূল্য দিচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৪৪০ টাকা। ফলে প্রতি মণে প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা অতিরিক্ত লাভের সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই লাভ কৃষকদের হাতে না গিয়ে সিন্ডিকেটভুক্ত ব্যবসায়ীদের পকেটে গেছে বলে অভিযোগ তাদের। জায়গা না থাকলে বরাদ্দ দেওয়া হলো কেন?’ ক্ষুব্ধ কৃষকদের প্রশ্ন, যদি কামারগাঁ খাদ্যগুদামে ধান রাখার পর্যাপ্ত জায়গা না-ই থাকে, তাহলে সেখানে ৫৫৫ মেট্রিক টনের বরাদ্দ দেওয়া হলো কেন? তাদের অভিযোগ, গুদামে জায়গা সংকটের অজুহাত দেখিয়ে বরাদ্দের একটি অংশ সদর খাদ্যগুদামে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ ওই বরাদ্দের সুযোগ থেকে স্থানীয় কৃষকরা বঞ্চিত হয়েছেন। রাজনৈতিক প্রভাবে তালিকা তৈরির অভিযোগ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ক্ষমতাসীন দলের এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, কিছু রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে ইউনিয়ন ভাগ করে বিশ্বস্ত লোকজনের মাধ্যমে কৃষকদের জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে তালিকা প্রস্তুত করেছেন। তিনি বলেন, শুরুতে প্রকৃত কৃষক এবং অতীতে বঞ্চিত কৃষকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির স্বার্থের কারণে তা বাস্তবায়ন হয়নি। তিনি আরও বলেন, সরকার কৃষকের স্বার্থে ধানের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু একশ্রেণির প্রভাবশালী ব্যক্তি সেই সুবিধা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছেন। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। গুদাম কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি অভিযোগের বিষয়ে জানতে একাধিকবার কামারগাঁ খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আতিকুর রহমানের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা পারভীন বলেন, ধান সংগ্রহের বিষয়ে তিনি, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ডিসি ফুড) এবং আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক (আরসি ফুড) তদন্ত করেছেন। তদন্তে কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, "গুদাম কর্মকর্তা একটু বেশি কথা বলে এবং বেশি বুঝে। তবে তাঁর এক সপ্তাহের মধ্যে বদলি হতে পারে। প্রকৃত কৃষক ধান দিতে পারেননি এবং প্রায় ২০০ মেট্রিক টন বরাদ্দ বিক্রির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, "কৃষকরাই ধান দিয়েছেন। বরাদ্দ বিক্রি হয়নি। গুদামে জায়গা সংকট থাকায় কিছু ধান তানোর সদর খাদ্যগুদামে সংরক্ষণ করা হয়েছে।#
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: রোকনুজ্জামান রোকন নির্বাহী সম্পাদক: ইফতেখার আলম সম্পাদক কর্তৃক উত্তর নওদাপাড়া, পো: সপুরা, রাজশাহী-৬২০৩ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল: ০১৭১১-২০৮ ১৭২, ০১৮৩৪-৮৬১ ০০৭ ইমেইল: dainiksobujnagar@gmail.com
Copyright © 2025 দৈনিক সবুজ নগর