
নাজমুল হাসান সিয়াম্।।
সবুজ বৃক্ষে ঘেরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল তরুণ স্বপ্নবাজের যাত্রা শুরু হয়েছিল উত্তরের জনপদের দিকে। গন্তব্য যেখানে বাতাসের কানে কানে ক্লান্তিহীন কথা বলে প্রমত্তা পদ্মা। লক্ষ্য ছিল কোনো তাত্ত্বিক ক্লাসরুম নয়, বরং সাংবাদিকতার এক জীবন্ত ল্যাবরেটরিকে চেনা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের ৫২তম আবর্তনের শিক্ষার্থীদের কলম আর ক্যামেরা এবার তাই থমকে দাঁড়াল রাজশাহীর, ‘কমিউনিটি রেডিও পদ্মা ৯৯.২ এফএম’-এর দোরগোড়ায়।
যান্ত্রিক শহরের কোলাহল ও যমুনার সেতু পেরিয়ে যখন বাসটি পদ্মার পলিমাটি ছোঁয়া জনপদে প্রবেশ করল, তখনই বাতাসের তরঙ্গে ভাসতে শুরু করল ৯৯.২ এফএম-এর সুর। শিক্ষার্থীদের কানে সেই সিগন্যাল পৌঁছাতেই শুরু হলো এক অন্যরকম শিহরণ। পাঠ্যবইয়ের পাতায় পড়া ‘কমিউনিটি রেডিও’ যে কেবল সংজ্ঞা নয়, বরং একটা জনপদের শ্বাস-প্রশ্বাস, তা বোঝা গেল স্টুডিওর ভেতরে ঢুকতেই। শিক্ষার্থীরা দেখলেন, মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে কেউ সহজ বাংলায় কথা বলছে প্রান্তিক কৃষকের সার ও বীজের অধিকার নিয়ে, কেউ বা মায়াবী কণ্ঠে শোনালো চরাঞ্চলের কোনো ঝরে পড়া শিশুর ফের স্কুলে ফেরার হার না মানা গল্প।
রেডিও পদ্মার স্টুডিওর ভেতরে ঢোকার পর যখন ‘অন-অফ’ লেখা লাল বাতিটি জ্বলে উঠল, চারদিকে নেমে এলো এক পিনপতন নীরবতা। কিন্তু সেই গভীর নীরবতার ভেতরেই যেন শিক্ষার্থীরা শুনতে পাচ্ছিলেন হাজারো সুবিধাবঞ্চিত মানুষের না বলা চিৎকার। তারা অবাক হয়ে দেখলেন, কীভাবে একটি ছোট স্টুডিওর চার দেয়াল থেকে ছড়িয়ে পড়া শব্দগুলো চরাঞ্চলের মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কমিউনিটি রেডিওর জাদুকরী শক্তিতে মুগ্ধ শিক্ষার্থীরা উপলব্ধি করলেন সাংবাদিকতা মানে কেবল বড় বড় শিরোনাম বা ক্ষমতার দাপট নয়, সাংবাদিকতা হলো অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক পরম মানবিক অস্ত্র।
সারাদিন স্টুডিওর কর্মযজ্ঞ, ট্রান্সমিটারের গর্জন আর ব্রডকাস্টের কৌশল দেখে পড়ন্ত বিকেলে শিক্ষার্থীরা যখন প্রমত্তা পদ্মার ধু-ধু চরে গিয়ে বসলেন, তখন তাদের চোখেমুখে অন্যরকম এক প্রাপ্তির উজ্জ্বলতা। কেউ অপলক তাকিয়ে ছিলেন দিগন্তের দিকে, কেউ বা বালুচরে বসে ভাবছিলেন আগামীর সাংবাদিকতা নিয়ে।
পরিদর্শনের এই বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে বিভাগের অভিভাবক অধ্যাপক আমেনা ইসলাম আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “সাংবাদিকতা কেবল তথ্যের আদান-প্রদান নয়, এটি মানুষের সাথে হৃদয়ের সেতুবন্ধন। আমি চেয়েছি আমার শিক্ষার্থীরা দেখুক, কীভাবে একটি স্থানীয় রেডিও স্টেশন গণমানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে কাজ করে। আজকের এই অভিজ্ঞতা তাদের শেকড়কে চিনতে শেখাবে।”
পরিদর্শনে আসা এক শিক্ষার্থী আবেগঘন কণ্ঠে বললেন, “আমরা আজ কেবল একটি অফিস দেখিনি, দেখেছি মানুষের জীবনের সঙ্গে তথ্যের এক নিবিড় সেতুবন্ধন। ৯৯.২ এফএম আমাদের শিখিয়ে দিলÑস্টুডিওর কাঁচের দেয়াল ছাপিয়ে মানুষের মনে জায়গা করে নেওয়াই প্রকৃত গণমাধ্যম।” পাশ থেকে অন্য এক শিক্ষার্থী ভাবুক কণ্ঠে যোগ করলেন, “মাঠের সাংবাদিকতা যে কত গভীর ও শেকড়সন্ধানী হতে পারে, তা এই ইথারের তরঙ্গই আজ বুঝিয়ে দিল।”
সূর্য যখন পদ্মার দিগন্তরেখায় রক্তিম আভা ছড়িয়ে টুপ করে তলিয়ে যাচ্ছিল, তখন একদল আগামীর কলম সৈনিকের ডায়েরিতে জমা হলো নতুন এক অভিজ্ঞতার কাব্য। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই লাল মাটির ক্যাম্পাসে ফিরে যাওয়ার সময় তাদের সবার মনেই যেন প্রতিধ্বনি হচ্ছিল রেডিও পদ্মার সেই পরিচিত টিউনটি।
ক্যাম্পাস জীবনের হাজারো স্মৃতির ভিড়ে রাজশাহীর বাঘার সেই ছোট স্টুডিওটি এখন তাদের কাছে এক জীবন্ত আলোকবর্তিকা। যা তাদের ক্যারিয়ারের প্রতিটি বাঁকে বারবার মনে করিয়ে দেবেÑসত্য আর সেবার ব্রত নিয়ে কথা বলতে হবে সাধারণ মানুষের ভাষায়, মিশে থাকতে হবে আমাদের মাটির অতি কাছাকাছি। ইথারের সেই সুর যেন তাদের কানে কানে বলে গেলÑ”সাংবাদিকতা হোক মানুষের জন্য, মানুষের কাছের।#