___ ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রক্তক্ষয়ী ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিল। এই অভ্যুত্থান কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্র সংস্কার এবং একটি বৈষম্যহীন, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েমের এক দৃঢ় অঙ্গীকার। হাজারো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এই 'নতুন বাংলাদেশে' সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল—প্রতিটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ হবে জুলাইয়ের চেতনার প্রতিফলন। তবে সাম্প্রতিক নির্বাচনে ভোটের চিত্র এবং শপথ গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে জনমনে গভীর প্রশ্ন জেগেছে: হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই বাংলাদেশ কি তবে সেই পুরনো তিমিরেই ডুবে থাকবে? ভোটের সমীকরণ ও আদর্শিক চ্যুতির আশঙ্কা নির্বাচনী প্রচারণার সময় বিরোধী শিবিরের পক্ষ থেকে জনগণের অংশগ্রহণ ও ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে যে জোরালো অবস্থান তৈরি করা হয়েছিল, তা ছিল জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষার সাথে সংহতি প্রকাশের একটি মাধ্যম। কিন্তু বাস্তবে যখন জনমতের বিপরীতে ভিন্ন চিত্র ফুটে ওঠে, তখন তা কেবল রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং সাধারণ ভোটারের বিশ্বাসের মূলে আঘাত হানে।
প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা: প্রচারণায় স্বচ্ছতা ও জনমতের কথা বলা হলেও, সংসদীয় যাত্রার শুরুতেই যখন বৈপরীত্য দেখা যায়, তখন জুলাইয়ের সেই রক্তস্নাত বিপ্লব বড় ধরনের ধাক্কা খায়।
শহীদের ত্যাগের অবমূল্যায়ন: বর্তমান সংসদকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ফসল হিসেবে মনে করা হচ্ছে। অথচ সংসদীয় কার্যক্রমে যদি গণদাবির প্রতিফলন না ঘটে এবং রাজনৈতিক দ্বৈতনীতি বজায় থাকে, তবে তা শহীদদের ত্যাগের প্রতি চরম অসম্মান প্রদর্শনের শামিল হবে। শপথের রাজনীতি ও বিশেষ ইশারা একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় শপথ গ্রহণ কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি জনগণের আমানত রক্ষার পবিত্র অঙ্গীকার। তবে যে প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং শপথ নেওয়ার ত্বরিত পদক্ষেপ লক্ষ্য করা গেছে, তা অনেক বিশ্লেষকের মতে একটি বিশেষ 'ইশারা' বহন করে। এই পদক্ষেপ কি সংস্কারের মূল সুরকে পাশ কাটিয়ে পুরনো ধারার রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদের দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে? জুলাইয়ের মূল দাবি ছিল আমূল সংস্কার, কিন্তু সংসদীয় কাঠামোতে স্বচ্ছতার অভাব থাকলে সেই সংস্কারের পথ রুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা প্রবল হয়। তিমির কি কাটবে না? "যেই তিমিরের বাংলাদেশ, সেই তিমিরেই ডুবে থাকা"—এই আক্ষেপ আজ প্রতিটি সচেতন নাগরিকের। জুলাইয়ের অভ্যুত্থান ছিল অন্ধকারের বুক চিরে আলোর পথে যাত্রার নাম। কিন্তু রাজনীতির অন্দরমহলে যদি স্বচ্ছতার অভাব থাকে এবং সাধারণ মানুষের ম্যান্ডেটকে পাশ কাটিয়ে কৌশলগত রাজনীতি বড় হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেই আলোর রেখা ফিকে হয়ে আসে। শুরুতেই এই ধরণের আদর্শিক বিচ্যুতি গণতন্ত্রকামী মানুষের মনে এক গভীর আস্থার সংকট তৈরি করেছে।
উপসংহার: এতকিছুর পরেও একটি জাতি হিসেবে বাংলাদেশ এখনো আশাবাদী। জনগণ প্রত্যাশা করে যে, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো বর্তমান সংকট ও আস্থার ঘাটতি নিরসনে আন্তরিক হবে এবং জাতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষাকে সর্বোচ্চ সম্মান জানাবে। ক্ষমতার দম্ভ বা কৌশলগত রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে জুলাইয়ের শহীদদের রক্ত আর পঙ্গুত্ববরণকারী হাজারো তরুণের স্বপ্নকে ধারণ করাই এখন সময়ের দাবি জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়, তবেই তিমির বিদীর্ণ করে বাংলাদেশ একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ভোরে পৌঁছাতে পারবে। অন্যথায়, ইতিহাসের পাতায় এই পরিবর্তন কেবল একটি সুযোগসন্ধানী ক্ষমতার হাতবদল হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে!#
... লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: রোকনুজ্জামান রোকন নির্বাহী সম্পাদক: ইফতেখার আলম সম্পাদক কর্তৃক উত্তর নওদাপাড়া, পো: সপুরা, রাজশাহী-৬২০৩ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল: ০১৭১১-২০৮ ১৭২, ০১৮৩৪-৮৬১ ০০৭ ইমেইল: dainiksobujnagar@gmail.com
Copyright © 2025 দৈনিক সবুজ নগর