— ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম:
ভূমিকা: নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহার বা প্রতিশ্রুতি একটি দেশের ভবিষ্যৎ পথরেখা নির্ধারণ করে। সম্প্রতি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিল্প এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে ১০ দফা সম্বলিত যে কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করেছে, তা জনমনে ব্যাপক কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। এই প্রতিশ্রুতিগুলো একদিকে যেমন জনকল্যাণমুখী ও আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণা দেয়, অন্যদিকে বাংলাদেশের বর্তমান ভঙ্গুর সামষ্টিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এগুলোর বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে যায়।
১. অর্থনৈতিক কাঠামোর বাস্তবতা প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৬-৮% বরাদ্দ এবং শিল্পে ৩ বছর ইউটিলিটি চার্জ ফ্রি রাখা।
সংকট: বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত (Tax-to-GDP ratio) দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন (প্রায় ৮.৫% - ৯%)। এই সীমিত রাজস্ব আয় দিয়ে বাজেটের সিংহভাগ ব্যয় হয় সরকারি বেতন-ভাতা ও ঋণের সুদ পরিশোধে।
চ্যালেঞ্জ: স্বাস্থ্য খাতে ৮% বরাদ্দ দিতে হলে শিক্ষা বা প্রতিরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের ব্যয় চরমভাবে ছাঁটাই করতে হবে, যা একটি রাষ্ট্রের ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
২. কল্যাণ রাষ্ট্র বনাম আর্থিক চাপ গ্র্যাজুয়েটদের জন্য ১০ হাজার টাকা মাসিক ভাতা এবং সুদবিহীন ঋণ দেওয়ার বিষয়টি একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের আদর্শ মডেল।
বাস্তবতা: ৫ লক্ষ গ্র্যাজুয়েটকে বছরে এই সুবিধা দিতে গেলে যে বিশাল অংকের তহবিল প্রয়োজন, তার উৎস নিশ্চিত করা কঠিন। দেশের ব্যাংকিং খাত যেখানে বর্তমানে তারল্য সংকট ও খেলাপি ঋণের ভারে জর্জরিত, সেখানে নতুন করে বড় অংকের সুদবিহীন ঋণ বিতরণ ব্যাংকগুলোর সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে।
৩. কাঠামোগত সংস্কার ও আধুনিকায়ন প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যে 'স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড' এবং 'বন্ধ কারখানা চালুর মালিকানা মডেল' বেশ আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত।
সম্ভাবনা: একটি একক কার্ডের মাধ্যমে সকল নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে প্রশাসনিক দুর্নীতি ও অপচয় নাটকীয়ভাবে কমে আসবে।
শ্রমিক অংশীদারিত্ব: বন্ধ কারখানায় শ্রমিকদের ১০% মালিকানা দেওয়ার প্রস্তাবটি বৈপ্লবিক। এটি বাস্তবায়িত হলে শিল্পক্ষেত্রে অস্থিরতা কমবে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়বে। তবে এর জন্য বিদ্যমান শ্রম আইন ও মালিকানা স্বত্বের আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন।
৪. শিক্ষা ও শিক্ষক: একটি অনালোচিত অধ্যায় ১০ দফা কর্মসূচিতে স্বাস্থ্য বা শিল্পের ওপর যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, শিক্ষা ও শিক্ষকদের মানোন্নয়নের বিষয়টি সেখানে তুলনামূলকভাবে অনেকটাই আড়ালে রয়ে গেছে।
প্রান্তিকায়ন: একটি জাতির প্রকৃত রূপান্তরের কারিগর হলেন শিক্ষক। ইশতেহারে গ্র্যাজুয়েট ভাতার কথা থাকলেও শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা, স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো কিংবা গবেষণায় বিনিয়োগের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপের অভাব পরিলক্ষিত হয়।
ঝুঁকি: মানসম্মত শিক্ষা এবং শিক্ষকদের উপযুক্ত মর্যাদা নিশ্চিত না করে কেবল 'ভাতা' নির্ভর অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে ব্যর্থ হতে পারে। শিক্ষা খাতের এই নীরবতা ইশতেহারটির একটি বড় কাঠামোগত দুর্বলতা।
৫. এটি কি বাস্তবসম্মত নাকি চটকদারি? এই ইশতেহারকে এক কথায় 'চটকদারি' বলা যেমন কঠিন, তেমনি 'পুরোপুরি বাস্তবসম্মত' বলাও কঠিন। কেন বাস্তবসম্মত নয়: বর্তমানের উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, ডলার সংকট এবং বিশাল বৈদেশিক ঋণের চাপে থাকা বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে এতগুলো ব্যয়বহুল প্রকল্প হাতে নেওয়া প্রায় অসম্ভব।
কেন ইতিবাচক: এই প্রতিশ্রুতিগুলো একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করে। যদি রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা যায় এবং ইসলামী অর্থনীতির আদলে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা যায়, তবে দীর্ঘমেয়াদে এগুলো অর্জন করা সম্ভব।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, জামায়াতে ইসলামীর এই প্রতিশ্রুতিগুলো একটি 'আদর্শবাদী রূপরেখা'। এগুলো বাস্তবায়ন কেবল তখনই সম্ভব যখন দেশে সুশাসন নিশ্চিত হবে এবং জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আদায়ের হার অন্তত দ্বিগুণ করা যাবে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এগুলোকে 'শর্ট-টার্ম' বা স্বল্পমেয়াদী লক্ষ্য না ধরে ২০-৩০ বছরের একটি 'লং-টার্ম ভিশন' হিসেবে বিবেচনা করা বেশি যুক্তিসঙ্গত। রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং দক্ষ আমলাতান্ত্রিক কাঠামো ছাড়া এই উচ্চাভিলাষী স্বপ্নগুলো স্রেফ কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে!#
... লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক