— ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র আমূল বদলে গেছে। দীর্ঘ দেড় দশক পর রাজনৈতিক ময়দানে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী উভয় দলই এখন অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে দৃশ্যমান। তবে এই নতুন প্রেক্ষাপটে দীর্ঘদিনের মিত্র দল দ ’টির মধ্যে সম্পর্কের ফাটল এবং আদর্শিক দূরত্ব ক্রমশ: প্রকট হচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জামায়াতে ইসলামীকে একটি বড় বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে যে অনীহা ও কঠোর অবস্থান দেখিয়েছেন, তা দেশের রাজনীতিতে নতুন এক মেরুকরণের আভাস দিচ্ছে।
ফখরুলের কঠোর অবস্থান ও নেপথ্য কারণ সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকার এবং ঘরোয়া রাজনৈতিক জনসভায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্যে জামায়াত সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ও কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি পরিলক্ষিত হয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকগণ এর পেছনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন:
১. অতিরঞ্জিত গুরুত্বের দায়মুক্তি: কলকাতার জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম ‘এই সময়’-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মির্জা ফখরুল অকপটে স্বীকার করেছেন যে, অতীতে বিএনপি জামায়াতকে তাদের প্রকৃত শক্তির চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলেছিল। তাঁর সাফ কথা, জামায়াতকে আর "মাথায় উঠতে দেওয়া হবে না"। এটি মূলত তৃণমূল ও মিত্রদের প্রতি একটি শক্ত বার্তা।
২. ভোটের মাঠে শক্তিমত্তা বনাম ক্যাডার রাজনীতি: বিএনপি মনে করে, জামায়াতের একটি সুসংগঠিত ক্যাডার ভিত্তি থাকলেও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে তাদের প্রভাব সীমিত। বিশেষ করে জামায়াতের প্রস্তাবিত 'আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব' (PR) পদ্ধতির নির্বাচনের দাবিকে বিএনপি মহাসচিব "নির্বাচনকে ভয় পাওয়া" হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, সরাসরি ভোটে জামায়াতের আসন সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকটির বেশি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
৩. আদর্শিক ও ধর্মীয় সংঘাত: ঠাকুরগাঁওয়ের এক জনসভায় ফখরুল সরাসরি জামায়াতের ধর্মীয় রাজনীতির মূলে আঘাত করে বলেন, "জামায়াতের টিকিট কাটলেই কেউ বেহেশতে যেতে পারবে না"। এটি জামায়াতের ধর্মীয় আবেগকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার একটি প্রত্যক্ষ কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে বর্তমান প্রেক্ষাপট বিশ্লেষকগণ বিএনপির এই অবস্থানকে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে দেখছেন। প্রথমত: আওয়ামী লীগ বিহীন ময়দানে বিএনপি এখন নিজেকে একমাত্র অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও একক বৃহৎ শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে মরিয়া। দ্বিতীয়ত: আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের ‘উদারবাদী ও গণতান্ত্রিক’ দল হিসেবে পরিচিত করতে বিএনপি এখন জামায়াতের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। তৃতীয়ত: জামায়াত কর্তৃক অন্যান্য ইসলামী দলগুলোকে নিয়ে একটি স্বতন্ত্র বলয় তৈরির চেষ্টা বিএনপিকে শঙ্কিত করে তুলেছে যে, ভবিষ্যতে একটি শক্তিশালী ‘তৃতীয় শক্তি’র উত্থান তাদের ভোটব্যাংকে ভাগ বসাতে পারে।
উপসংহার: মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জামায়াত-বিরোধী এই কঠোর অবস্থান কেবল তাৎক্ষণিক কোনো ক্ষোভ নয়, বরং এটি বিএনপির দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। জামায়াতকে বড় দল হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ার মাধ্যমে তিনি যেমন দলের তৃণমূলকে চাঙ্গা করছেন, তেমনি মিত্রদের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে স্বকীয়তা প্রমাণের চেষ্টা করছেন। তবে রাজনীতির সমীকরণ সবসময় সরলরেখায় চলে না। জামায়াত ইস্যুতে মির্জা ফখরুলের এই ব্যক্ত অবস্থান পরবর্তী সময়ে দলের আনুষ্ঠানিক অবস্থানে পরিণত হবে কি না, তা নিয়ে খোদ বিএনপির ভেতরেই গুঞ্জন রয়েছে।
বিশ্লেষণে মনে হয়, কৌশলগত কারণে দলের সর্বোচ্চ মহল থেকে হয়তো একসময় বলা হতে পারে— "এটি দলের আনুষ্ঠানিক অভিমত নয়, বরং তাঁর ব্যক্তিগত মতামত।" তবে সামনের নির্বাচনে এই দূরত্ব বিএনপিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে সহায়তা করবে নাকি ভোট ভাগাভাগির মাধ্যমে অন্য কোনো জটিল সমীকরণ তৈরি করবে, তা সময়ই বলে দেবে!#
... # লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: রোকনুজ্জামান রোকন নির্বাহী সম্পাদক: ইফতেখার আলম সম্পাদক কর্তৃক উত্তর নওদাপাড়া, পো: সপুরা, রাজশাহী-৬২০৩ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল: ০১৭১১-২০৮ ১৭২, ০১৮৩৪-৮৬১ ০০৭ ইমেইল: dainiksobujnagar@gmail.com
Copyright © 2025 দৈনিক সবুজ নগর