
নিকোলাস বিশ্বাস
নেপালে সাম্প্রতিক ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা বিশ্বকে এক কঠিন বাস্তবতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে: জলবায়ু দুর্যোগ কোনো সীমান্ত মানে না। এগুলো জাতীয় সীমান্তে থেমে যায় না, ধনী-দরিদ্র দেশের মধ্যে পার্থক্য করে না, আর কোনো দেশ বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে সামান্য অবদান রাখে বলে তাকে রেহাইও দেয় না। জলবায়ু পরিবর্তন একটি অভিন্ন বৈশ্বিক সংকট হলেও এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে সেই দেশগুলোতেই, যারা এই সমস্যার জন্য সবচেয়ে কম দায়ী।
নেপাল এই বৈষম্যের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। বৈশ্বিক নিঃসরণ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেপাল বৈশ্বিক কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণে ০.১ শতাংশেরও কম অবদান রাখে, অথচ দেশটি জলবায়ু-সম্পর্কিত দুর্যোগের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যা দেখিয়েছে, কীভাবে চরম আবহাওয়া দ্রুত মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে - ধ্বংস করতে পারে ঘরবাড়ি, অবকাঠামো ও মানুষের জীবিকা।
নেপালের ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করলে এই ট্র্যাজেডি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতমালার আবাসস্থল নেপাল হিমালয় অঞ্চলের অংশ, যাকে বিপুল বরফ-মজুদের কারণে কখনও কখনও "তৃতীয় মেরু" (Third Pole) বলা হয়। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে:
গত তিন দশকে নেপালের হিমবাহগুলো তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে।
এটি পানি নিরাপত্তা, কৃষি ও হিমালয়-নির্ভর নদীর ওপর নির্ভরশীল কোটি কোটি মানুষের জন্য তীব্র হুমকি তৈরি করছে।
হিমবাহ দ্রুত গলে পানির প্রবাহ বেড়ে গিয়ে বিপজ্জনক হিমবাহ-হ্রদ (Glacial Lakes) সৃষ্টি হচ্ছে, যা হঠাৎ নিচের দিকে ভয়াবহ বন্যা ঘটাতে পারে।
সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যায় মানুষের দুর্ভোগ ও প্রাণহানির চিত্র এখন আর উপেক্ষা করার মতো নয়। চেন্নাই ভিত্তিক গণমাধ্যম The Hindu-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী (৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত):
মৃতের সংখ্যা: ১,৩৪৪ জন
নিখোঁজ: প্রায় ৫,০০০ জন
উদ্ধারকৃত ব্যক্তি: ১৩,০০০ জন (নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক)
সংকটে থাকা শিশু: প্রায় ২২,০০০ শিশু নিরাপদ পানিহীন, তীব্র খাদ্য ও অক্সিজেন সংকটে রয়েছে।
এগুলো নিছক কোনো পরিসংখ্যান নয় - এগুলো এমন মানুষের জীবন, যারা সাম্প্রতিক ভয়াবহ দুর্যোগে চরম মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে।
এটাই জলবায়ু পরিবর্তনের মূল বৈষম্য: যারা এই সংকটে সবচেয়ে কম অবদান রেখেছে, তারা প্রায়ই সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতির শিকার হয়। দশকের পর দশক ধরে শিল্পোন্নত দেশগুলো গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বড় অংশের জন্য দায়ী। UNEP Emissions Gap Report 2025 অনুযায়ী:
বিশ্বের ২০টি বৃহত্তম অর্থনীতির জোট (G20 Countries) ২০২৪ সালে বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের প্রায় ৭৭ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল।
অন্যদিকে নেপাল ও বাংলাদেশের মতো দেশগুলো জলবায়ু-সম্পর্কিত বিপদের উচ্চ ঝুঁকির মুখোমুখি। এই বৈষম্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে: যে সংকটের জন্য গুটি কয়েকটি দেশ বহুলাংশে দায়ী, তার ক্ষতির মাশুল সবাই কেন সমানভাবে গুনবে?
জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত বিষয় নয়; এটি ন্যায়বিচার, উন্নয়ন, দারিদ্র্য, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক দায়িত্বের বিষয়। নেপালে সংঘটিত বন্যা সেখানকার জনগোষ্ঠীর কয়েক দশকের উন্নয়ন-অর্জন কয়েক ঘণ্টায় ধ্বংস করে দিয়েছে। রাস্তা-ঘাট, সেতু, স্কুল, ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান বিলীন হয়ে গেছে।
বায়ুমণ্ডল কোনো রাজনৈতিক সীমান্ত মেনে চলে না। একটি দেশে নিঃসৃত কার্বন ডাই-অক্সাইড বৈশ্বিক বায়ুমণ্ডলে মিশে সর্বত্র উষ্ণতা বাড়ায়। এ কারণে:
ঐতিহাসিক দায়িত্ব: বেশি নিঃসরণকারী উন্নত দেশগুলোর ওপর ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলকে সহায়তা করার বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে।
অভিযোজন (Adaptation): দ্রুত আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো ও কার্যকর দুর্যোগ প্রস্তুতি প্রয়োজন।
নিঃসরণ হ্রাস: বৈশ্বিক তাপমাত্রা কমানোর জন্য সম্মিলিতভাবে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ বন্ধ করতে হবে।
নেপালের অভিজ্ঞতা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা। বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, পাকিস্তান সহ এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশ একই ধরনের জলবায়ু ঝুঁকির (বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিধস, খরা, তাপপ্রবাহ) মুখোমুখি। হিমালয়ে যা ঘটে তা নিম্নাঞ্চলের নদীব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে।
করণীয় পদক্ষেপ:
আঞ্চলিক সহযোগিতা: দুর্যোগ প্রস্তুতি, আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও নদী ব্যবস্থাপনায় যৌথ পদক্ষেপ।
আন্তর্জাতিক অর্থায়ন: জাতিসংঘ ও বিধিবদ্ধ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরাসরি আর্থিক ও অর্থবহ কারিগরি সহায়তা নিশ্চিতকরণ।
বাস্তব উদ্যোগ: নিরাপদ অবকাঠামো, সহনশীল জীবিকা ও প্রযুক্তি হস্তান্তর।
জলবায়ু পরিবর্তন বৈশ্বিক, কিন্তু জলবায়ু ঝুঁকি চরম অসম। রাজনৈতিক সীমান্ত দেশগুলোকে আলাদা করতে পারে, কিন্তু আমাদের গ্রহকে সংযুক্ত রাখা বায়ুমণ্ডল, মহাসাগর ও আবহাওয়াব্যবস্থা থেকে কোনো দেশকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না।
জলবায়ু ন্যায়বিচার (Climate Justice) কোনো দয়া বা দান নয়; এটি আমাদের সবার যৌথ দায়িত্ব। নেপালের বন্যাকে একটি বিচ্ছিন্ন জাতীয় ট্র্যাজেডি হিসেবে না দেখে সমগ্র বিশ্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখতে হবে। পরিবর্তিত জলবায়ু থেকে কোনো দেশ একা রক্ষা পেতে পারে না, এবং এর পরিণতি মোকাবিলায় কোনো দেশকেই একা ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।
লেখক পরিচিতি:
নিকোলাস বিশ্বাস একজন মিডিয়া ফ্রিল্যান্সার এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: রোকনুজ্জামান রোকন নির্বাহী সম্পাদক: ইফতেখার আলম সম্পাদক কর্তৃক উত্তর নওদাপাড়া, পো: সপুরা, রাজশাহী-৬২০৩ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল: ০১৭১১-২০৮ ১৭২, ০১৮৩৪-৮৬১ ০০৭ ইমেইল: dainiksobujnagar@gmail.com
Copyright © 2025 দৈনিক সবুজ নগর