__ ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ক্ষমতা যখন জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং শাসকশ্রেণি সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার ও আর্তনাদকে অবজ্ঞা করতে শুরু করে, তখন শ্লেষ ও উপহাস থেকেই জন্ম নেয় গণব্রোহের সবচেয়ে শক্তিশালী স্ফুলিঙ্গ। সমসাময়িক ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে ঠিক তেমনি একটি অভূতপূর্ব ও রূপান্তরকামী অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে, যা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। রাষ্ট্রক্ষমতার অহংকার এবং প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিদের একপেশে মানসিকতা কীভাবে একটি পুরো প্রজন্মকে ফিনিক্স পাখির মতো জাগিয়ে তুলতে পারে, তার এক জ্বলন্ত উদাহরণ হলো ভারতের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলন।
শিক্ষার্থী ও তরুণ সমাজের মেধা, শ্রম এবং ভবিষ্যৎকে জলাঞ্জলি দিয়ে যখন বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁস, দুর্নীতি ও শিক্ষাব্যবস্থার চরম অবনতি ঘটানো হচ্ছিল, তখন রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে আন্দোলনরত বেকার যুবসমাজ ও ছাত্রদের অবমূল্যায়ন করে একরকম অবজ্ঞাসূচক গালি হিসেবে 'ককরোচ' (Cockroach) বা আরশোলা বলে সম্বোধন করা হয়। কিন্তু অপমানকে শক্তিতে রূপান্তর করার যে অনন্য কৌশল তরুণ প্রজন্ম আয়ত্ত করেছে, তা কেবল এই গালিকে ভুল প্রমাণই করেনি, বরং জন্ম দিয়েছে এক নতুন রাজনৈতিক শক্তির—'ককরোচ জনতা পার্টি' বা সিজেপি (CJP)। আজ দিল্লির রাজপথ থেকে শুরু করে ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া এই আন্দোলন কেবল কিছু সাধারণ দাবি আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রূপ নিয়েছে এক সর্বাত্মক সরকারবিরোধী ও ‘মোদি হটাও’ আন্দোলনে। দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়া এই গণবিক্ষোভ কি তবে দক্ষিণ এশিয়ায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান কিংবা নেপালের যুব-আন্দোলনের পথ ধরেই এগোচ্ছে—এই প্রশ্ন এখন বিশ্ব রাজনীতি বিশ্লেষকদের মুখে মুখে।
গালি থেকে প্রতীক: ‘ককরোচ’ থেকে সিজেপি’র উত্থান কোনো একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার পতনের পেছনে তার নৈতিক অবক্ষয়ই সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় উচ্চশিক্ষা, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস (বিশেষ করে NEET ও অন্যান্য সরকারি চাকরির পরীক্ষা), এবং বেকারত্বের চরম সংকটে পিষ্ট হয়ে যখন শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছিল, তখন রাষ্ট্র তাদের কথা শোনার বদলে কটাক্ষের আশ্রয় নেয়। আদালতের উচ্চ পর্যায় থেকে বা প্রভাবশালী মহল থেকে বেকার তরুণ ও সমালোচকদের ‘ককরোচ’ বা পরজীবী হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, যা তরুণ সমাজকে মারাত্মকভাবে ক্ষুব্ধ করে তোলে। শাসকদের এই অবমূল্যায়ন দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে আসা তরুণ গবেষক ও শিক্ষার্থী অভিজিৎ দীপকের হাত ধরে অনলাইনে শ্লেষাত্মক ও প্রতীকী প্রতিবাদ হিসেবে জন্ম নেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। আরশোলা এমন একটি resilient বা প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকা প্রাণী, যাকে সহজে ধ্বংস করা যায় না। দেশের বঞ্চিত ও কোণঠাসা যুবসমাজ এই প্রতীকটিকে সানন্দে লুফে নেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিমেষেই কোটি কোটি অনুসারী যুক্ত হয় সিজেপির সাথে, যা ক্ষমতাসীন দল বা শাসকশ্রেণির ডিজিটাল জনসমর্থনকেও ছাড়িয়ে যায়। যা শুরু হয়েছিল ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মের একটি ব্যাঙ্গাত্মক প্রতিবাদ হিসেবে, তা অতি দ্রুত লাখ লাখ শিক্ষার্থীর পদচারণায় দিল্লির যন্তর মন্তর এবং রাজপথের বাস্তব সংঘাতে রূপ নেয়।

দিল্লির রাজপথ থেকে দেশজুড়ে দাবানল: কাঠামোগত সংকটের বিস্ফোরণ দিল্লিতে সিজেপি-র ডাকে আয়োজিত সাম্প্রতিক সমাবেশ এবং সংসদ ভবন অভিমুখে লংমার্চ ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ হাতে প্ল্যাকার্ড ও ‘ককরোচ’ এর প্রতীকী মুখোশ পরে যখন ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যায়, তখন নড়েচড়ে বসে কেন্দ্রীয় সরকার। এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তিগুলোর বিশদ বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি প্রধান দিক সামনে আসে: শিক্ষাব্যবস্থার মারাত্মক বিপর্যয়: বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া এবং এর ফলে লাখ লাখ মেধাবী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়া। কোটি কোটি যুবকের কর্মসংস্থানের স্বপ্ন আজ কেবল ফাইলবন্দী দুর্নীতিতে হারিয়ে গেছে।
আত্মহত্যার মহামারী: পরীক্ষার ভীতি, দীর্ঘসূত্রিতা ও চরম অনিশ্চয়তায় বিপর্যস্ত হয়ে বহু শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়ার ঘটনায় কোনো কার্যকর বিচার না হওয়া।
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ: বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং একটি স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক শিক্ষানীতি প্রণয়নের এক দফা দাবি।
গণতান্ত্রিক সংকোচন: নরেন্দ্র মোদির সরকারের অধীনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব হওয়া, ভিন্নমতকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ বা ‘শত্রু’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ। পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ, ইন্টারনেট শাটডাউন এবং গণগ্রেপ্তার সত্ত্বেও আন্দোলন দমানো যায়নি। উল্টো এটি নরেন্দ্র মোদির তৃতীয় মেয়াদের সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। সাধারণ মানুষের মুখে এখন একটাই স্লোগান—এই কাঠামোগত দুর্নীতির অবসান এবং ক্ষমতার পরিবর্তন।

দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতিতে পরিবর্তনের হাওয়া: বাংলাদেশ ও নেপালের ছায়া ইতিহাস কখনো হুবহু নিজেকে পুনরাবৃত্তি না করলেও তার গতিপ্রকৃতিতে একধরনের যোগসূত্র ও ধারাবাহিকতা খুঁজে পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় ছাত্র-তরুণদের নেতৃত্বে যে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে, তা গোটা অঞ্চলের শাসকদের মনে ভয়ের কাঁপুনি ধরিয়ে দিয়েছে।
দক্ষিণ এশীয় তারুণ্যের জাগরণ: বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান: ২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এমন এক অপ্রতিরোধ্য গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করেছিল, যা দীর্ঘমেয়াদি স্বৈরাচারী ক্ষমতার পতন ঘটিয়েছিল। শিক্ষার্থীরা প্রমাণ করেছিল যে সুসংহত ঐক্যের সামনে কোনো স্বৈরাচারী রাষ্ট্রযন্ত্র দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। নেপালের যুব আন্দোলন: নেপালের তরুণ সমাজেও প্রথাগত ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতির বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ এবং রাজপথের জোয়ার দেখা গেছে, যা ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলগুলোকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। ভারতের এই ‘ককরোচ’ বা সিজেপি আন্দোলনকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বাংলাদেশ ও নেপালের সেই তারুণ্যনির্ভর গণঅভ্যুত্থানের ভারতীয় সংস্করণ হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন।
সোশ্যাল মিডিয়ার নিখুঁত ব্যবহার, নেতার চেয়ে আদর্শ ও নীতির প্রাধান্য, এবং প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সরাসরি রুখে দাঁড়ানোর এই প্রবণতা দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ প্রজন্মের একটি অভিন্ন রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বকে ফুটিয়ে তোলে। শাসকশ্রেণি যখনই তরুণদের শক্তিকে ‘তুচ্ছ’ বা ‘পোকামাকড়’ জ্ঞান করেছে, তখনই তারা ইতিহাসের অংশ হয়ে ধুলিসাৎ হয়েছে—এই বার্তাটি আজ অত্যন্ত স্পষ্ট। উপসংহার বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতের ‘ককরোচ’ আন্দোলন কোন দিকে মোড় নেবে এবং তা চূড়ান্তভাবে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষমতার পরিবর্তনে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিশ্চিত করে বলা এই মুহূর্তে বলাই মুশকিল। তবে একটি বিষয় দিবালোকের মতো স্পষ্ট—ভারতের তরুণ প্রজন্ম দীর্ঘদিনের ভীতি ও শৃঙ্খল ভেঙে রাস্তায় নেমে এসেছে। যে অবজ্ঞাসূচক গালি ‘ককরোচ’ হিসেবে তাদের অপমান করতে চেয়েছিল, আজ তা সমগ্র দেশের অধিকারহারা মানুষের মুক্তির প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
দিল্লি থেকে শুরু হওয়া এই দাবানল প্রমাণ করে দিয়েছে যে, বুলেট বা ব্যারিকেড দিয়ে মানুষের মৌলিক অধিকার ও ন্যায়সংগত ক্ষোভকে বেশি দিন চেপে রাখা যায় না। দক্ষিণ এশিয়ার মাটিতে ছাত্র-জনতার জাগরণের যে নতুন ধারা বাংলাদেশ ও নেপালের হাত ধরে সূচিত হয়েছিল, ভারতের এই তরুণ আন্দোলন সেই একই মুক্তির স্রোতধারারই এক অনিবার্য ধারাবাহিকতা। পরিবর্তনের এই হাওয়া শেষ পর্যন্ত কোন উপকূলে গিয়ে পৌঁছাবে, তা সময়ই বলে দেবে; তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে—এ কথা নিশ্চিত যে, ভারতের রাজনীতির চালচিত্র আর আগের মতো থাকবে না!#
.... লেখক একজন শিক্ষক, কবি, গবেষক, প্রাবন্ধিক ও সমাজচিন্তক।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: রোকনুজ্জামান রোকন নির্বাহী সম্পাদক: ইফতেখার আলম সম্পাদক কর্তৃক উত্তর নওদাপাড়া, পো: সপুরা, রাজশাহী-৬২০৩ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল: ০১৭১১-২০৮ ১৭২, ০১৮৩৪-৮৬১ ০০৭ ইমেইল: dainiksobujnagar@gmail.com
Copyright © 2025 দৈনিক সবুজ নগর