
ফারুক হোসেন নয়ন (বদরগঞ্জ, রংপুর প্রতিনিধি): সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা আমাদের এই বাংলাদেশ। এক সময় গ্রামে গ্রামে গোয়াল ভরা গরু, পুকুর ভরা মাছ আর মাটি দিয়ে তৈরি শান্তির নীড় ছিল সার্বজনীন চিত্র। মাটির তৈরি ঘর যেন ছিল শান্তির এক অপূর্ব রূপ। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালের প্রখর রোদে মাটির ঘর এতটাই আরামদায়ক ও শীতল থাকত যে, কেবল গ্রামাঞ্চলের মানুষই এর প্রকৃত মর্ম বুঝতে পারত।
তবে সময়ের বিবর্তনে ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় আজ গ্রামীণ ঐতিহ্য মাটির বাড়ি প্রায় বিলুপ্তির পথে।
সম্প্রতি সরেজমিনে রংপুর জেলার বদরগঞ্জ উপজেলা ঘুরে মাটির ঘরের দেখা মেলে লোহানিপাড়া ইউনিয়নের নয়াপাড়া গ্রামে। কাছে গিয়ে দেখা যায়, শৈল্পিক সৌন্দর্যে ভরা মাটির ঘরটি তার অতীত ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরে এখনও দাঁড়িয়ে আছে। ঘরটি দেখে মনে হয়, সে যেন নীরবে বলছে—“এক সময় আমার ব্যাপক কদর থাকলেও, আধুনিকতার ভীড়ে আজ আমি মূল্যহীন।”
লোহানিপাড়া ইউপির সাবেক সদস্য ও ৮৫ বছর বয়সী প্রবীণ ব্যক্তি আব্দুর রাজ্জাক জানান:
“আগে আমাদের এলাকায় অসংখ্য মাটির বাড়ি ছিল। মাটির তৈরি ঘরগুলোতে আবহাওয়া এতটাই শীতল থাকত যে গরমের দিনে ইলেকট্রিক ফ্যানের তেমন প্রয়োজন হতো না। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে মানুষের রুচিবোধের পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে নতুন প্রজন্ম আর মাটির তৈরি ঘরে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না।”
তিনি আরও জানান, আধুনিকতার ছোঁয়া এবং বর্ষাকালে মাটির ঘর ধসে পড়ার ঝুঁকির কারণে গ্রামাঞ্চলের মানুষ এখন মাটির ঘর ভেঙে পাকা বাড়ি তৈরি করছেন। তবে মাটির ঘর দেশীয় গ্রামীণ ঐতিহ্যের প্রতীক। তাই মাটি দিয়ে তৈরি ঘরগুলোকে আধুনিকায়ন করে গ্রামীণ অতীত ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা উচিত।
বদরগঞ্জ উপজেলার লোহানিপাড়া কাঁচাবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক আকবর আলী (৭৫) স্মৃতিচারণ করে বলেন:
“ছোটবেলায় আমিও মাটির তৈরি ঘরে বাস করেছি। ঘরগুলো এতটাই ঠান্ডা থাকত যে ইলেকট্রিক ফ্যানের কোনো প্রয়োজনই পড়ত না। মাটির তৈরি ঘর গ্রাম-বাংলার এক সময়ের মূল ঐতিহ্য, যার সংরক্ষণ এখন অত্যন্ত জরুরি।”
তিনি সতর্ক করে আরও বলেন, “আমরা যদি এখনই এই মাটির ঘর সংরক্ষণ না করি, তবে আগামী প্রজন্ম জানতেই পারবে না মাটির তৈরি ঘরের গল্প। আমাদের গৌরবময় গ্রামীণ ঐতিহ্যকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদেরই।#