___ ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম:
ভূমিকা: বর্তমান বিশ্বের অনেক দেশে গণতন্ত্রের মোড়কে একধরণের স্বৈরতান্ত্রিক চর্চা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা 'ইলেক্টোরাল অটোক্রেসি' (Electoral Autocracy) বা গণতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র বলে অভিহিত করছেন। এখানে ভোট উৎসব হয় ঠিকই, কিন্তু নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কেবল ওই ব্যালট পেপার পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে। পরবর্তী সময়ে জনগণের মতামতকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র যখন গুটিকয়েক মানুষের স্বার্থ রক্ষায় নিয়োজিত হয়, তখন গণতন্ত্র তার প্রাণ হারায়। প্রকৃত গণতন্ত্র মানে কেবল নির্দিষ্ট সময় অন্তর নির্বাচন নয়, বরং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে জনগণের নিরবচ্ছিন্ন ও অর্থবহ সম্পৃক্ততা।
১. গণতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্রের বৈশ্বিক সংকট বিংশ শতাব্দীতে গণতন্ত্রের যে জোয়ার এসেছিল, একবিংশ শতাব্দীতে এসে তার অবক্ষয় দৃশ্যমান। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টিভেন লেভিটস্কি তাঁর 'How Democracies Die' গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, বর্তমান যুগে গণতন্ত্র বন্দুকের নলে নয়, বরং নির্বাচিত নেতাদের মাধ্যমেই ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়। যখন নেতৃত্ব জনগণের কণ্ঠস্বর উপেক্ষা করতে শুরু করে এবং বিচার বিভাগ বা গণমাধ্যমের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে কুক্ষিগত করে, তখনই রাষ্ট্রের প্রকৃত চরিত্র হারায়। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন এমন এক রাজনৈতিক দর্শন, যা রাষ্ট্রকে শাসকের হাত থেকে মুক্ত করে জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেবে।
২. জনমালিকানা ও সামাজিক চুক্তি (Social Contract) রাষ্ট্রের ওপর জনগণের এই মালিকানার ধারণাটি আধুনিক নয়, বরং এটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মূল ভিত্তি। জন লক এবং রুশোর 'সামাজিক চুক্তি' (Social Contract) মতবাদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার উৎস জনগণ। নেতৃত্ব কেবল জনগণের পক্ষ থেকে ক্ষমতা পরিচালনার লাইসেন্স পায়।
ট্রাস্টিশিপ মডেল: মহাত্মা গান্ধী বা নেলসন ম্যান্ডেলার মতো জননেতারা ক্ষমতাকে ভোগের বস্তু নয়, বরং জনগণের পক্ষ থেকে অর্পিত একটি 'আমানত' বা 'ট্রাস্টি' হিসেবে দেখতেন।
নাগরিক ক্ষমতায়ন: সাধারণ মানুষকে এই সত্যটি হৃদয়ঙ্গম করতে হবে যে—তাঁরাই এই রাষ্ট্রের প্রকৃত অংশীদার। নাগরিকদের ঘাম ও করের টাকায় রাষ্ট্র পরিচালিত হয়, তাই অধিকার আদায় করা কারো করুণা বা অনুগ্রহ নয়, বরং এটি তাঁদের আইনগত ও নৈতিক প্রাপ্য।
৩. টেকসই রাষ্ট্র গঠনে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কেবল মানসিক পরিবর্তন যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সুদৃঢ় কাঠামোগত সংস্কার। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত 'চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্সেস' (Checks and Balances) পদ্ধতি কার্যকর করতে হবে:
আইনের শাসন: রাষ্ট্রের কাঠামোগুলোকে এমনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে যেখানে আইন সবার জন্য সমান হবে।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা: নর্ডিক দেশগুলোর (যেমন নরওয়ে বা ফিনল্যান্ড) মতো এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন যেখানে একজন সাধারণ নাগরিকও অত্যন্ত ক্ষমতাধর ব্যক্তির ভুল ধরিয়ে দেওয়ার সাহস ও নিরাপত্তা লাভ করবে।
বিকেন্দ্রীকরণ: ক্ষমতা কেবল কেন্দ্র বা সচিবালয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে, যাতে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে সাধারণ মানুষের সরাসরি ভূমিকা থাকে।
৪. আধুনিক নেতৃত্বের নৈতিক দায়বদ্ধতা একজন প্রকৃত জননেতা কেবল বর্তমানের জনপ্রিয়তার দিকে তাকান না, বরং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখেন। বর্তমান বিশ্বের সংকটে আমরা এমন নেতৃত্ব চাই যারা গৎবাঁধা সংজ্ঞার বাইরে গিয়ে মানুষের "মালিকানা" ফিরিয়ে দেবে। যখন নেতৃত্ব নিজেকে 'অধিপতি' মনে না করে 'তত্ত্বাবধায়ক' মনে করবে, তখনই সাধারণ মানুষ এই দেশটিকে নিজের বাড়ি বলে ভাবতে শুরু করবে।
উপসংহার: দেশ কেবল একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ড বা মানচিত্র নয়; দেশ হলো কোটি মানুষের আবেগ, অধিকার এবং বেঁচে থাকার স্বপ্ন। প্রকৃত দেশপ্রেম তখনই জাগ্রত হয় যখন নাগরিকরা রাষ্ট্রকে নিজের বলে অনুভব করে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি সমাজ বিনির্মাণ করা, যেখানে প্রতিটি নাগরিক বুক ফুলিয়ে বলতে পারবে—"এই দেশটা আমার।" আর সাধারণ মানুষের মনে এই স্বত্বাধিকার ও প্রত্যয় জাগিয়ে তোলাই হবে একজন প্রকৃত জননেতার প্রধান সার্থকতা এবং ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি!#
.. লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক