__ ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম:
ভূমিকা: গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠত্ব কেবল ভোটাধিকার বা সংখ্যাগরিষ্ঠতার শাসনে নয়, বরং এর মূল সৌন্দর্য নিহিত থাকে পরমতসহিষ্ণুতা এবং গঠনমূলক সমালোচনার সংস্কৃতিতে। বর্তমান বৈশ্বিক ও জাতীয় প্রেক্ষাপটে ‘বাকস্বাধীনতা’ শব্দটি বহুল ব্যবহৃত হলেও এর সাথে যুক্ত ‘দায়বদ্ধতা’ বিষয়টি প্রায়ই উপেক্ষিত থাকছে। সমালোচনা করার অধিকার যেমন গণতন্ত্রের প্রাণ, তেমনি সেই সমালোচনার ভাষা ও ভঙ্গি নির্ধারণে বিবেক-বিবেচনা ও পরিমিতিবোধ থাকা একটি উন্নত শিক্ষার পরিচায়ক। অধিকার থাকলেই যেমন সব স্থানে তার যথেচ্ছ বহিঃপ্রকাশ শোভন নয়, তেমনি রাজনীতিতেও স্থান-কাল-পাত্রের জ্ঞানহীন সমালোচনা শেষ পর্যন্ত অরাজকতার জন্ম দেয়। অধিকার বনাম রুচির পরিমিতিবোধ মানবিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যেমন গভীর ভালোবাসার অধিকার থাকলেও তা প্রকাশের ক্ষেত্রে স্থান-কাল-পাত্র ও শালীনতার প্রয়োজন হয়, অন্যথায় সেই পবিত্র অনুভূতিটিও অসম্মানিত বা ‘বেইজ্জতিতে’ পর্যবসিত হতে পারে; জাতীয় রাজনীতির ময়দানও এর ব্যতিক্রম নয়। একজন নাগরিক বা রাজনীতিকের সরকার বা ব্যবস্থার সমালোচনা করার পূর্ণ অধিকার আছে। কিন্তু সেই অধিকার যখন ব্যক্তিগত কুৎসা, অশোভন ভাষা বা ভিত্তিহীন অপবাদে রূপ নেয়, তখন তা আর গণতান্ত্রিক চর্চা থাকে না। জাতীয় রাজনীতিতে সুস্থ ধারা বজায় রাখতে হলে সমালোচনা হতে হবে ‘মন খুলে’, কিন্তু তার ভিত্তি হতে হবে ‘বিবেক’ এবং ‘তথ্য’।
গণমাধ্যম ও বর্তমান সংকট: ভাষা যখন অস্ত্র বর্তমানে আমাদের দেশে সাধারণ জনগণের একটি বড় অংশ থেকে শুরু করে সাংবাদিক, উপস্থাপক এবং টকশোর আলোচকদের মধ্যে ভাষার ব্যবহারের যে অস্থিরতা দেখা যায়, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গণমাধ্যম যেখানে জনমত গঠনের আয়না হওয়ার কথা ছিল, সেখানে যথেচ্ছা শব্দের ব্যবহার এবং আক্রমণাত্মক ভঙ্গি হতাশাজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। ভাষার নৈরাজ্য: টকশোর টেবিলে যুক্তি দিয়ে একে অপরকে খণ্ডন করার চেয়ে চিৎকার বা অবমাননাকর শব্দ প্রয়োগের প্রবণতা বাড়ছে।
দায়িত্বহীন উপস্থাপনা: অনেক ক্ষেত্রে উপস্থাপকগণ নিরপেক্ষতা হারিয়ে প্ররোচনামূলক ভূমিকা পালন করছেন, যা জনমানসে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে।
শিক্ষার অভাব: সমালোচনা করতে জানাটাও যে একটি বিশেষ ‘শিক্ষা’—এই উপলব্ধির অভাব আজ সর্বত্র। বিবেচনাহীন সমালোচনা কেবল ঘৃণার দেয়াল তৈরি করে, কোনো সমস্যার সমাধান দেয় না। জাতীয় রাজনীতিতে গণতান্ত্রিকতার নিরিখ একটি উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সমালোচনার লক্ষ্য হতে হবে ‘সংস্কার’, ‘উচ্ছেদ’ নয়। যখন সাধারণ মানুষ বা সাংবাদিকরা বিবেকের আদালতে দাঁড়িয়ে পরিশীলিত ভাষায় সত্য তুলে ধরেন, তখন রাষ্ট্রের কর্ণধাররা সেই সমালোচনাকে গুরুত্ব দিতে বাধ্য হন। কিন্তু ভাষার ব্যবহার যখন রুচিহীন হয়, তখন মূল সমস্যাটি আড়ালে পড়ে গিয়ে কেবল বিতর্কই মুখ্য হয়ে ওঠে। ফলে গণতন্ত্রের প্রকৃত সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে বাধাগ্রস্ত হয়।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, অধিকারের সঠিক প্রয়োগই একজন মানুষকে প্রকৃত মানুষ এবং একটি রাষ্ট্রকে প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তর করে। মন খুলে সমালোচনা করা বীরত্বের লক্ষণ, তবে সেই সমালোচনাকে মার্জিত ও অর্থবহ রাখাটা উন্নত ব্যক্তিত্ব ও শিক্ষার বহিঃপ্রকাশ। আমাদের জাতীয় রাজনীতি, গণমাধ্যম এবং প্রাত্যহিক সংলাপে যদি ‘বিবেক’ ও ‘স্থান-কাল-পাত্র’ বোধের পুনর্জাগরণ না ঘটে, তবে বাকস্বাধীনতা কেবল বিশৃঙ্খলার নামান্তর হয়ে থাকবে। একটি সুন্দর ও মর্যাদাশীল রাষ্ট্র বিনির্মাণে আমাদের অবশ্যই ‘অধিকার’ এবং ‘বিবেচনাবোধের’ মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে!#
... লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক