______ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
গত কয়েক বছরে বিশ্বজুড়ে একটি নাম বারবার সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছে—জেফরি এপস্টাইন। আপাতদৃষ্টিতে তিনি ছিলেন একজন মার্কিন কোটিপতি, যার বন্ধু তালিকায় ছিলেন বিশ্বের প্রতাপশালী সব রাষ্ট্রপ্রধান, বিজ্ঞানী আর সেলিব্রেটিরা। কিন্তু এই আভিজাত্যের পর্দার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক ভয়াবহ অন্ধকার জগত। ক্ষমতা, অর্থ এবং প্রভাব খাটিয়ে তিনি বছরের পর বছর ধরে যে অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন, তা আজ বিংশ শতাব্দীর অন্যতম বড় কলঙ্ক হিসেবে বিবেচিত।
রহস্যময় উত্থান এপস্টাইনের ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল গণিতের শিক্ষক হিসেবে। কিন্তু শিক্ষকতা ছেড়ে তিনি যখন ওয়াল স্ট্রিটের আর্থিক দুনিয়ায় পা রাখেন, তখন থেকেই তার ভাগ্য বদলে যেতে থাকে। অতি অল্প সময়ে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া এই ব্যক্তিটি নিজের চারপাশে এমন এক প্রভাবের বলয় তৈরি করেছিলেন, যেখানে আইন পৌঁছাতে হিমশিম খেত। নিউ ইয়র্কের বিলাসবহুল প্রাসাদ থেকে শুরু করে ক্যারিবীয় সাগরে নিজের ব্যক্তিগত দ্বীপ—সবখানেই ছিল তার অবাধ বিচরণ। অভিযোগের পাহাড় ও ক্ষমতার অপব্যবহার এপস্টাইনের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ ছিল অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের পাচার এবং যৌন শোষণ।
তিনি এবং তার সহযোগী গিসলেন ম্যাক্সওয়েল এক বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি প্রভাবশালীদের কাছে অপ্রাপ্তবয়স্কদের পাঠাতেন এবং পরবর্তীতে সেই তথ্য ব্যবহার করে তাদের ব্ল্যাকমেইল করতেন। ২০০৮ সালে যখন প্রথম তার অপরাধ সামনে আসে, তখন তিনি এক রহস্যময় আইনি চুক্তির মাধ্যমে বড় শাস্তি এড়িয়ে যান। সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে—একজন অপরাধী কীভাবে এত সহজেই আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায়? এই উত্তর লুকিয়ে ছিল তার ডায়েরিতে থাকা বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নামের তালিকায়। পতন ও অমীমাংসিত মৃত্যু ২০১৯ সালের জুলাই মাসে নতুন তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তাকে পুনরায় গ্রেফতার করা হয়। সারা বিশ্ব যখন আশা করছিল এবার হয়তো পর্দার পেছনের রাঘববোয়ালদের মুখোশ উন্মোচিত হবে, ঠিক তখনই ঘটে এক নাটকীয় ঘটনা।
১০ আগস্ট, ২০১৯ তারিখে কড়া পাহারার ভেতর জেলখানায় তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে 'আত্মহত্যা' বললেও জনমনে গভীর সন্দেহ রয়ে গেছে। অনেকেরই ধারণা, প্রভাবশালীদের নাম ফাঁস হওয়া থেকে বাঁচাতে তাকে কৌশলে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার মৃত্যুর পরও এই মামলার রেশ কাটেনি; তার সহযোগী গিসলেন ম্যাক্সওয়েল বর্তমানে কারাগারে দীর্ঘমেয়াদি সাজা ভোগ করছেন।
উপসংহার: জেফরি এপস্টাইনের কাহিনী কেবল একজন ব্যক্তির অপরাধের গল্প নয়, বরং এটি ক্ষমতা আর অর্থের অপব্যবহারের এক চরম উদাহরণ। এটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, সমাজের উঁচুতলার মানুষরা কীভাবে আইনের উর্ধ্বে থাকার চেষ্টা করে। এপস্টাইন মারা গেছেন, কিন্তু তার রেখে যাওয়া ক্ষতগুলো আজও সমাজকে মনে করিয়ে দেয় যে, ন্যায়বিচারের পথ এখনো কণ্টকাকীর্ণ। তবে তার শিকার হওয়া নারীদের সাহসী অবস্থান বিশ্বব্যাপী 'মি টু' (Me Too) আন্দোলনের মতো প্রতিবাদী চেতনাকে আরও শক্তিশালী করেছে!#
.. লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: রোকনুজ্জামান রোকন নির্বাহী সম্পাদক: ইফতেখার আলম সম্পাদক কর্তৃক উত্তর নওদাপাড়া, পো: সপুরা, রাজশাহী-৬২০৩ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল: ০১৭১১-২০৮ ১৭২, ০১৮৩৪-৮৬১ ০০৭ ইমেইল: dainiksobujnagar@gmail.com
Copyright © 2025 দৈনিক সবুজ নগর