স্টাফ রিপোর্টার, সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরা রেঞ্জের সুন্দরবন অভয়ারণ্যে অবৈধভাবে মাছ ধরার সিন্ডিকেট ও লেনদেনের নিয়ন্ত্রণ এখন নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তির হাতে চলে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বুড়িগোয়ালিনীর মেজবাহ, আসাদ, মান্দারবাড়ি টহল ফাঁড়ির মাহফুজ, মোস্তাফিজ এবং হলদিয়া বুনিয়ার সানা রঞ্জন পাল ও জাহাঙ্গীর—এই চক্রের কাছে দীর্ঘদিন ধরে জিম্মি সাধারণ জেলেরা। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে একই স্টেশন ও রেঞ্জে দীর্ঘদিন অবস্থান করার ফলে এই সিন্ডিকেটগুলো আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
এই চক্রটিই মূলত জেলেদের সাথে ফরেস্ট অফিসের এসও (SO) এবং ওসিদের (OC) গোপন আঁতাত করিয়ে দেয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব লেনদেনের বড় অংশই সম্পন্ন হয় বিকাশের এজেন্ট নাম্বারের মাধ্যমে। এমনকি এসিএফ (ACF) এবং ডিএফও (DFO)-এর গতিবিধির আগাম তথ্য জেলেদের পৌঁছে দেওয়ার বিনিময়ে বুড়িগোয়ালিনী স্টেশনে মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেন হয়। তবে কঠোর নজরদারির ফলে এই সিন্ডিকেট আর জেলেদের শেষ রক্ষা হচ্ছে না।
সম্প্রতি সাতক্ষীরা রেঞ্জ এসিএফ-এর গোপন অভিযানে সুন্দরবন থেকে দু’টি বেন্দি জালের নৌকাসহ মোট ২২ জন আসামিকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে জালাল মাঝির ৯ জন এবং ইউসুফ মাঝির ১৩ জন লোক রয়েছেন। তাদের কাছ থেকে ৪১০ কেজি শাপলা পাতা মাছ জব্দ করা হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আটককৃত জেলেরা মান্দারবাড়ি এফজি মোস্তাফিজের সাথে কন্টাক্ট করেছিলেন। মোস্তাফিজ বুড়িগোয়ালিনী স্টেশনের ক্যাশিয়ার আসাদের মাধ্যমে স্টেশন কর্মকর্তা (এসও) মো জিয়াউর রহমান কে এবং মেজবাহর মাধ্যমে অতিরিক্ত রেঞ্জ কর্মকর্তা ফজলু সাহেবকে ম্যানেজ করার আশ্বাস দিয়েছিলেন। বিনিময়ে মান্দারবাড়ি ওসিকে ৫০ হাজার টাকা এবং নীলকমল ফাঁড়িতে ১০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা ছিল। প্রতি জনে লাখ লাখ টাকা দিয়েও ডিএফও এবং সদর এসিএফ-এর দূরদর্শিতার কারণে শেষ রক্ষা হয়নি এই অবৈধ মৎস্য শিকারিদের। এর আগে গত সপ্তাহে অপর এক অভিযানে নৌকাসহ ১২০ কেজি কাঁকড়া এবং ৩৬০টি নিষিদ্ধ আটন জব্দ করে সাতক্ষীরা রেঞ্জ।
আটককৃত জেলেদের দাবি, ফরেস্টের সাথে গোপন চুক্তি ছাড়া কেউই অভয়ারণ্যে প্রবেশের সাহস পায় না। তারা জানান, এবারও তারা মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে ঢুকেছিলেন, কিন্তু এসিএফ-এর আকস্মিক ও গোপন অভিযানের খবর সিন্ডিকেট আগে থেকে দিতে না পারায় তারা ধরা পড়েছেন। জেলেদের দেওয়া তথ্যমতে, কাদের মাঝির এই লোকগুলো মান্দারবাড়ি ফরেস্ট অফিসের বিএম মাহফুজুর রহমানের মাধ্যমে বুড়িগোয়ালিনীর ক্যাশিয়ার এফজি আসাদের হাত হয়ে স্টেশন কর্মকর্তা জিয়াকে ২০ হাজার টাকা নগদ প্রদান করেন। এছাড়া এফজি মেজবাহর মাধ্যমে সহকারী রেঞ্জ কর্মকর্তা ফজলুর রহমানকে আরও ২০ হাজার টাকা এবং মান্দারবাড়ি টহল ফাঁড়ির ওসিকে ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আটক এক জেলের আত্মীয় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "ফরেস্টের লোকরা টাকাও নিবে আবার আমাদের রক্ষা করতে পারবে না—এটা কেমন নীতি? স্টেশন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে নিচের তলার সবাই টাকা খায়। কথা ছিল এসিএফ বা ডিএফও অভিযানে নামলে আমাদের আগেই জানিয়ে দেওয়া হবে। এখন আমাদের ধরে নিয়ে গিয়ে তারাই আবার সুন্দর সুন্দর কথা বলে মামলা দিচ্ছে।"
এসব অভিযোগের বিষয়ে মান্দারবাড়ির এফজি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, "এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। জেলেদের সাথে আমাদের কোনো যোগাযোগ নেই।"
বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান বলেন, "আমি জেলেদের জিজ্ঞেস করেছিলাম তারা আমাকে চেনে কি না। তারা বলেছে আমাকে চেনে না। সুতরাং আমাদের সাথে তাদের যোগাযোগের কোনো সুযোগ নেই।"
সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) এ বিষয়ে বলেন, "আমরা কৌশল পরিবর্তন করে গভীর রাতে অভিযানে নামছি এবং এর সফলতা পাচ্ছি। সুন্দরবনকে অবৈধ দখলদারমুক্ত রাখতে এ ধরনের ঝটিকা অভিযান নিয়মিত চলবে। এখন থেকে আর কোনো ঘোষণা দিয়ে অভিযান হবে না।"
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা (ডিএফও) জেড এম এ হাসান কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, "আগে কোথায় কী হয়েছে, সেটা ভুলে যেতে হবে। নতুন বাংলাদেশে নতুনভাবে সুন্দরবন গড়ার প্রত্যয় নিয়ে আমরা কাজ করছি। সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগে কোনো সিন্ডিকেট থাকবে না। অভিযান হবে নতুন কৌশলে। দখল, চাঁদাবাজি ও অবৈধ লেনদেনের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স।"
তিনি আরও জানান, ইতিমধ্যে অনেক কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে এবং সাতক্ষীরা ও খুলনাসহ সকল রেঞ্জেই এই শুদ্ধি অভিযান অব্যাহত থাকবে।#
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: রোকনুজ্জামান রোকন নির্বাহী সম্পাদক: ইফতেখার আলম সম্পাদক কর্তৃক উত্তর নওদাপাড়া, পো: সপুরা, রাজশাহী-৬২০৩ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল: ০১৭১১-২০৮ ১৭২, ০১৮৩৪-৮৬১ ০০৭ ইমেইল: dainiksobujnagar@gmail.com
Copyright © 2025 দৈনিক সবুজ নগর