
মো মোহা: সফিকুল ইসলাম
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নজিরবিহীন ধ্বংসলীলার পর বিশ্বশান্তি, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৪৫ সালের২৪ অক্টোবর আত্মপ্রকাশ করেছিল জাতিসংঘ। আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের অভিশাপ থেকে মুক্ত রাখার প্রত্যয় নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই আন্তর্জাতিক সংস্থাটি ২০২৬ সালে পা দিল ৮১ বছরে। কিন্তু ৮১ বছর পর বিশ্বজুড়ে পালিত ‘জাতিসংঘ দিবস’-এর এই মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠেছে—সংস্থাটি কি তার প্রতিষ্ঠাকালীন প্রতিশ্রুতি পূরণে সক্ষম হয়েছে, নাকি অকার্যকর সংস্থায় পরিণত হচ্ছে?
প্রতিষ্ঠাকালে মাত্র ৫১টি দেশ নিয়ে শুরু করলেও বর্তমানে জাতিসংঘের সদস্যসংখ্যা ১৯৩। এর বাইরে ভ্যাটিকান ও ফিলিস্তিন পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র হিসেবে যুক্ত রয়েছে। তবে বিশ্বজুড়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সব রাষ্ট্রের সমান গুরুত্ব নেই। বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের একচ্ছত্র ‘ভেটো’ ক্ষমতা ও ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রায়শই বিশ্বশান্তি রক্ষায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। জাতীয় কৌশলগত স্বার্থ প্রাধান্য পাওয়ায় জাতিসংঘের কার্যকারিতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে গৃহহীন ও বাস্তুচ্যুত লাখ লাখ সাধারণ মানুষকে।
জাতিসংঘের ২০৩০ সালের ১৭টি ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’ (SDG) দারিদ্র্য ও বৈষম্য দূরীকরণে একটি অভিন্ন কাঠামো তৈরি করলেও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ঋণের বোঝা ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এর অগ্রগতি মন্থর হয়ে পড়েছে। জলবায়ু সংকটে যেসব দেশের অবদান সবচেয়ে কম, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোকেই তার সবচেয়ে বড় খেসারত দিতে হচ্ছে। তাই বিশ্ব আর্থিক কাঠামোর সংস্কার, সহজ শর্তে জলবায়ু অর্থায়ন এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাড়তে থাকা বৈরিতা জাতিসংঘের আস্থায় বড় আঘাত হেনেছে। ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে এই বিতর্ক প্রকাশ্যে রূপ নেয়। অধিবেশনে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মাইলেই জাতিসংঘকে ‘অকার্যকর সংস্থা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর ব্যর্থতার কড়া সমালোচনা করেন। অন্যদিকে, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ নিরাপত্তা পরিষদে সব অঞ্চলের ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে এবং ভেটো ক্ষমতা বিলুপ্ত করার পক্ষে জোরালো আহ্বান জানান।
মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা থাকলেও বর্তমানে ডিজিটাল নজরদারি, সেন্সরশিপ ও রাজনৈতিক সুবিধার কারণে মানবাধিকারের প্রয়োগ অসম হয়ে পড়েছে। জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতা ফেরাতে বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা ও নিরপেক্ষ তদন্ত সুনিশ্চিত করা জরুরি।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালিহ যথার্থই বলেছেন, “শান্তির পরিমাপ শুধু স্বাক্ষরিত চুক্তির মাধ্যমে নয়, বরং মানুষের জীবনে আসা পরিবর্তনের মাধ্যমেও করতে হবে।”
৮১ বছরে পদার্পণ করা জাতিসংঘের সাফল্য কেবল গৃহীত প্রস্তাব দিয়ে নয়; বরং সাধারণ মানুষের ওপর যুদ্ধের প্রভাব কমছে কিনা এবং মানবাধিকার সুরক্ষিত হচ্ছে কিনা—তার ওপরই নির্ভর করবে।
# লেখক পরিচিতি: সাংবাদিক ও সহকারি অধ্যাপক, বিনোদপুর ডিগ্রী কলেজ, শিবগঞ্জ।