
মোঃ মিজানুর রহমান
সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষের ফিতরাত বা স্বভাব হলো সুন্দর, আনন্দদায়ক ও কল্যাণকর ঘটনায় আনন্দিত হওয়া এবং দুঃখজনক অবস্থায় ব্যথিত হওয়া। ইতিহাসে যখনই মানুষ অন্যায় ও জুলুমের স্টীম রোলারে নিষ্পেষিত হয়েছে, তখনই মুক্তি পাওয়ার জন্য একজন ত্রাণকর্তাকে খুঁজেছে—যার নেতৃত্বে সকল অশুভ শক্তির অবসান ঘটবে।
মানুষ যখনই এই দুরবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে, তখনই স্বধর্মীয় ও স্বগোত্রীয় লোকদের নিয়ে আনন্দানুষ্ঠান করেছে। এই আনন্দানুষ্ঠানকেই কুরআন মাজীদে ‘ঈদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
ঈদ (عيد): অভিধান অনুযায়ী কোনো মর্যাদাবান ব্যক্তি বা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমবেত হওয়ার দিন বা স্মৃতিচারণের দিবসই ঈদ। প্রতিবছর নব আনন্দ নিয়ে ফিরে আসে বলেই একে ঈদ বলা হয় (আল-মুন্জিদ, পৃ. ৫৩৯)।
মিলাদ (میلاد): এর অর্থ জন্ম সময় বা জন্ম বৃত্তান্ত (আল-মুন্জিদ, পৃ. ৯১৮)। পারিভাষিক অর্থে জন্ম তারিখে কারো জীবনচরিত আলোচনা করা এবং তাঁর শিক্ষা গ্রহণের অঙ্গীকার করাই মিলাদ।
মুসলিম বিশ্বের ঈমানি প্রেরণার জয়ধ্বনি নিয়ে প্রতি বছর রবিউল আউয়াল মাসে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের মাঝে ফিরে আসে। কোনো নেয়ামত ও রহমত লাভ করলে আনন্দ প্রকাশ করা মানুষের স্বভাবজাত বিষয় এবং মহান আল্লাহর নির্দেশ।
“বলুন: আল্লাহর অনুগ্রহে ও তাঁর দয়ায়, সুতরাং এতে তারা আনন্দিত হোক।”
— (সূরা ইউনুস: ৫৮)
ইবনে জারির তাবারী (রহ.): হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, এখানে ‘অনুগ্রহ’ বলতে ইসলাম এবং ‘রহমত’ বলতে আল-কুরআন-কে বোঝানো হয়েছে।
আল্লামা জালালুদ্দিন সুয়ূতী (রহ.): আদ্দুররুল মানসুর তাফসীরে উল্লেখ করেন, হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মতে ‘অনুগ্রহ’ হলো ইলম এবং ‘রহমত’ হলেন স্বয়ং মুহাম্মদ (সা.)।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য কেবল রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি।” (সূরা আম্বিয়া: ১০৭)
যদি কুরআন ও দীন পাওয়ার কারণে আনন্দ করতে হয়, তবে যাঁর মাধ্যমে আমরা এ সব পেয়েছি—তাঁর আগমন দিবস যে কত বড় নেয়ামত, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
শেখ আবদুল হক মুহাদ্দেসে দেহলভী (রহ.) তাঁর ‘মা সাবাতা মিনাসসুন্নাহ’ গ্রন্থে লিখেছেন:
“লাইলাতুল কদর, শবে বরাত, শবে মেরাজ ও দুই ঈদের রাত—এ সবই রাহমাতুল্লিল আলামীনকে দান করা হয়েছে। যাকে দান করা রাত হাজার মাসের চেয়ে উত্তম, স্বয়ং তাঁর আগমন দিবস যে কত লক্ষ-কোটি দিবস-রজনীর চেয়ে উত্তম, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই।”
সামান্য জাগতিক নেয়ামত লাভ করলেও তা ঈদের কারণ হতে পারে। সূরা মায়িদার ১১৪ নম্বর আয়াতে হযরত ঈসা (আ.)-এর দোয়ার উল্লেখ আছে:
“হে আমাদের প্রভু! আমাদের জন্য ঊর্ধ্ব জগৎ হতে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ করুন। এ হবে আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের জন্য ঈদস্বরূপ।” (সূরা মায়িদা: ১১৪)
আকাশ থেকে খাদ্যের খাঞ্চা লাভ যদি সৃষ্টির আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত আনন্দোৎসব বা ‘ঈদ’-এর কারণ হতে পারে, তবে সৃষ্টির সেরা মানব, রহমতের ভাণ্ডার রাসূলে পাক (সা.)-এর আগমন দিবস কতখানি মর্যাদাবান ও আনন্দের, তা সহজেই অনুমেয়।
হযরত ইমাম বুখারী (রহ.) ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করেছেন। হযরত আব্বাস (রা.) আবু লাহাবের মৃত্যুর এক বছর পর তাকে স্বপ্নে দেখে তার অবস্থা জানতে চান।
আবু লাহাব জানায় যে, সে শাস্তির মধ্যেই আছে; তবে প্রতি সোমবার তার আযাব লাঘব করা হয় এবং শাহাদাত আঙুল দিয়ে পানি চুষে সে তৃপ্ত হয়। কারণ, সোমবার রাসূলে পাক (সা.)-এর জন্মের সুসংবাদ নিয়ে আসায় সে খুশিতে দাসী সুয়াইবাকে এই আঙুলের ইশারায় মুক্ত করে দিয়েছিল (ফাতহুল বারী, ৯ম খণ্ড, পৃ. ১১৮; আইনী, ২০/৯৫)।
ভাববার বিষয়:
যার ধ্বংসের কথা কুরআনে সরাসরি নাযিল হয়েছে, সেই কাফের আবু লাহাব যদি নবীজির (সা.) জন্মের খুশিতে দাসী মুক্ত করার কারণে প্রতি সোমবারে আযাব লাঘবের সুবিধা পায়—তবে একজন ঈমানদার মুসলমান ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উদযাপন করলে যে রহমত, বরকত ও মুক্তি লাভ করবে, তা সহজেই বোধগম্য।
কবি শেখ সাদী (রহ.)-এর ভাষায়:
“বন্ধুদের বঞ্চিত করার প্রশ্নই আসে না, তুমি তো এমন সত্তা যে, দুশমনের দিকেও লক্ষ্য রাখ।”
ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) পালনের মূল উদ্দেশ্য হলো:
মহানবী (সা.)-এর পুরো জীবনকে আয়নার মতো নিজের সামনে তুলে ধরা।
ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ জীবনকে তাঁর আদর্শ অনুযায়ী গড়ে তোলার সংকল্প গ্রহণ করা।
তাঁর মর্যাদা আলোচনার পাশাপাশি তাঁর সুন্নাতকে বাস্তব জীবনে পূর্ণাঙ্গভাবে অনুসরণ করা।
হযরত আলী (রা.) মহানবী (সা.)-এর প্রশংসা ও সুন্নাত অনুসরণের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলেন। তিনি বলেছেন:
“নবুওয়াত বৃক্ষের মাঝে তিনি বাছাইকৃত আলোর আধার, সম্মানের সর্বোচ্চ চূড়ায় অধিষ্ঠিত, অন্ধকারের বাতি এবং হেকমত ও প্রজ্ঞার উৎস-প্রস্রবণ।” (নাহজুল বালাগা, খুতবা ১০৭)
লেখক: মোঃ মিজানুর রহমান (গবেষক, কলামিস্ট ও শিক্ষক, দৌলতপুর আলিম মাদ্রাসা, খুলনা)
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো: রোকনুজ্জামান রোকন নির্বাহী সম্পাদক: ইফতেখার আলম সম্পাদক কর্তৃক উত্তর নওদাপাড়া, পো: সপুরা, রাজশাহী-৬২০৩ থেকে প্রকাশিত। মোবাইল: ০১৭১১-২০৮ ১৭২, ০১৮৩৪-৮৬১ ০০৭ ইমেইল: dainiksobujnagar@gmail.com
Copyright © 2025 দৈনিক সবুজ নগর