___ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: ২০২৬ সালের শুরুতে এসে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম ক্ষমতাধর রাষ্ট্র ইরান এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে দীর্ঘকালীন আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতি, অন্যদিকে শাসনব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে রাজপথে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ—তেহরানকে এক কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে। ইরানের এই অস্থিতিশীলতা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে, বিশেষ করে বাংলাদেশের ইসলামি রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শিক গতিপথ ও কৌশলগত চিন্তায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলছে।
ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক চিত্র: বহুমুখী চ্যালেঞ্জ বর্তমান সময়ে ইরানের স্থিতিশীলতা তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর হুমকির সম্মুখীন:
অর্থনৈতিক ধস ও জনরোষ: ইরানি রিয়ালের রেকর্ড পতনের ফলে নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। ২০২৫ সালের শেষভাগ থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ২০২৬-এর শুরুতে এসে বৃহত্তর জনদাবিতে রূপ নিয়েছে, যা সরাসরি বর্তমান শাসন কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করছে।
নেতৃত্বের সংকট ও ভূ-রাজনীতি: আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ইসরায়েল ও পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে চলমান ছায়াযুদ্ধ ইরানকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্লান্ত করে তুলেছে।
সামাজিক পরিবর্তন: ইরানের তরুণ প্রজন্ম বর্তমানে প্রথাগত ধর্মীয় কঠোরতার চেয়ে নাগরিক স্বাধীনতা ও বিশ্বায়নমুখী জীবনব্যবস্থাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশের ইসলামি দলগুলোর ওপর প্রভাব ইরানের এই পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি বাংলাদেশের ইসলামি ধারার রাজনীতির জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ও প্রভাব নিয়ে এসেছে:
১. আদর্শিক মডেলের পরিবর্তন: এক সময় ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব বাংলাদেশের অনেক ইসলামি কর্মীর কাছে 'সফল বিপ্লবের' আদর্শ ছিল। কিন্তু ইরানের বর্তমান অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ প্রমাণ করছে যে, শুধু ধর্মীয় আবেগ দিয়ে আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভব নয়। ফলে বাংলাদেশের দলগুলো এখন 'ইরান মডেল'-এর পরিবর্তে তুরস্ক বা মালয়েশিয়ার মতো 'গণতান্ত্রিক ইসলামি মডেল'-এর দিকে বেশি ঝুঁকছে।
২. শিয়া-সুন্নি মেরুকরণ ও বাস্তবতা: বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতি মূলত সুন্নি (দেওবন্দি ও সালাফি) ঘরানার। ইরানের (শিয়া প্রধান) বর্তমান সংকটে বাংলাদেশের দলগুলোর মধ্যে কোনো সরাসরি সহানুভূতি কাজ না করলেও, তারা একে একটি 'ইসলামি শক্তি'র দুর্বলতা হিসেবে দেখছে। তবে তারা এখন ইরানের অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের রাজনীতিতে অর্থনৈতিক ও নাগরিক অধিকারের ইস্যুগুলোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
৩. পশ্চিমা বিরোধী সেন্টিমেন্ট ও সতর্কতা: ইরানের ওপর পশ্চিমা চাপকে বাংলাদেশের দলগুলো সাধারণত 'ইসলাম বিদ্বেষ' হিসেবে চিত্রিত করে। তবে ইরানের বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা এটিও বুঝতে পারছে যে, আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কোনো রাষ্ট্রের জন্য কাম্য নয়। ফলে বাংলাদেশের ইসলামি দলগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবমুখী পররাষ্ট্রনীতির কথা বলছে।
৪. ধর্ম ও আধুনিকতার সমন্বয়: ইরানে হিজাব বা অন্যান্য সামাজিক ইস্যুতে যে বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে, তা বাংলাদেশের ইসলামি দলগুলোকে কিছুটা রক্ষণশীল অবস্থান থেকে সরে এসে আধুনিক ও নমনীয় হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করাচ্ছে। তারা বুঝতে পারছে যে, যুব সমাজকে সাথে রাখতে হলে আধুনিক নাগরিক চাহিদার স্বীকৃতি দিতে হবে।
উপসংহার: ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতা বিশ্বব্যাপী ইসলামি রাজনীতির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। বাংলাদেশের ইসলামি দলগুলোর জন্য এটি একটি শিক্ষার ক্ষেত্র যে, দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে বা জনসমর্থন ধরে রাখতে হলে কেবল ধর্মীয় এজেন্ডা যথেষ্ট নয়; বরং সুশাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জনগণের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন অপরিহার্য। ইরানের এই সংকট বাংলাদেশের ইসলামি দলগুলোকে আরও বেশি জাতীয়তাবাদী, জনমুখী এবং বাস্তববাদী হতে উদ্বুদ্ধ করছে।#
# লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক