__ ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: পবিত্র কোরআন কেবল একটি ঐশী জীবনবিধানই নয়, বরং এটি আরবি সাহিত্যের এক অপরাজেয় ও অলৌকিক মোজেজা। কোরআনের শব্দচয়ন, বাক্য গঠন এবং অলংকারশাস্ত্র (বালাগাত) অত্যন্ত নিগূঢ় ও অর্থবহ। সূরা আল-কদরে বর্ণিত ‘আলফি শাহর’ বা ‘এক হাজার মাস’ শব্দসমষ্টি নিয়ে যুগে যুগে মুফাসসির, ভাষাবিদ ও আধ্যাত্মিক সাধকগণ গভীর বিশ্লেষণ করেছেন। বাহ্যিক দৃষ্টিতে একে একটি গাণিতিক সংখ্যা মনে হলেও, কোরআনের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট ও আরবি ভাষার আলঙ্কারিক প্রয়োগ বিবেচনা করলে দেখা যায়, ‘হাজার’ শব্দটি এখানে মূলত একটি অসীম বা বিশাল সময়কাল এবং গুণগত শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
আরবি ভাষায় সংখ্যার রূপক ব্যবহার: একটি ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আরবি ব্যাকরণ ও সাহিত্যের বালাগাত (Rhetoric) অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু সংখ্যা সবসময় সুনির্দিষ্ট পরিমাণ বোঝাতে ব্যবহৃত হয় না। একে বলা হয় ‘আদাদুল কাসরাহ’ (Numbers of Multiplicity) বা আধিক্যজ্ঞাপক সংখ্যা। তৎকালীন আরব সমাজে সাত, সত্তর, সাতশ বা হাজার—এই সংখ্যাগুলো ‘অগণিত’ বা ‘বিশাল’ বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। ৭০-এর উদাহরণ: সূরা তাওবায় মুনাফিকদের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে— “আপনি যদি তাদের জন্য ৭০ বারও ক্ষমা প্রার্থনা করেন, তবুও আল্লাহ তাদের ক্ষমা করবেন না।” (৯:৮০)। এখানে ‘৭০’ মানে ঠিক ৭১ এর আগের সংখ্যা নয়; বরং এর অর্থ হলো আপনি যতবারই বা অসংখ্যবার প্রার্থনা করুন না কেন, তাদের ক্ষমা করা হবে না।
১০০০-এর প্রয়োগ: প্রাচীন আরবে ‘হাজার’ ছিল গণনার সর্বোচ্চ পরিচিত একটি বড় একক। এর চেয়ে বড় সংখ্যার ব্যবহার তখন সীমিত ছিল। ফলে কোনো কিছুর আধিক্য বা বিশালত্ব বোঝাতে ‘হাজার’ শব্দটি রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সূরা আল-কদরে ‘হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ’ বলতে মূলত এমন এক বরকতময় সময়কে নির্দেশ করা হয়েছে, যা মানুষের পার্থিব সময়ের হিসাব বা কল্পনার অতীত। গাণিতিক সীমাবদ্ধতা বনাম আধ্যাত্মিক অসীমতা সাধারণ গাণিতিক হিসেবে ১০০০ মাসকে ১২ দিয়ে ভাগ করলে ৮৩ বছর ৪ মাস পাওয়া যায়। যদিও সাধারণ মানুষের অনুধাবনের জন্য এই হিসাবটি সহায়ক, কিন্তু কোরআনের আধ্যাত্মিক ব্যঞ্জনায় এটি সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে কয়েকটি শক্তিশালী যুক্তি রয়েছে:
১. সীমাবদ্ধতা বনাম অসীমতা: যদি এটি নির্দিষ্ট ৮৩ বছরই হতো, তবে লাইলাতুল কদরের মাহাত্ম্য একটি নির্দিষ্ট মানব আয়ুর ফ্রেমে আটকা পড়ে যেত। কিন্তু ‘খাইরুম মিন’ (চেয়ে শ্রেষ্ঠ) শব্দবন্ধটি প্রমাণ করে যে, এটি কোনো গাণিতিক সমীকরণ নয়। এর অর্থ হলো—এমন এক সময় যা হাজার মাস কেন, যেকোনো দীর্ঘ সময়ের চেয়েও বেশি কল্যাণকর।
২. গুণগত মান (Qualitative Excellence): আল্লাহ তায়ালা এখানে সময়কে ‘পরিমাণ’ (Quantity) দিয়ে নয়, বরং ‘গুণ’ (Quality) দিয়ে বিচার করেছেন। এক রাতের ইবাদত যখন অসীম রহমতের ধারক হয়, তখন তা পার্থিব বছরের তুলাদণ্ডে মাপা অসম্ভব।
৩. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সান্ত্বনা: রেওয়ায়েত অনুযায়ী, বনী ইসরাঈলের এক মুজাহিদের এক হাজার মাস ধরে জিহাদ ও ইবাদতের কথা শুনে সাহাবীগণ নিজেদের স্বল্প আয়ু নিয়ে বিষণ্ণ হয়ে পড়েছিলেন। তাঁদের এই আক্ষেপ দূর করতে আল্লাহ এই আয়াত নাজিল করেন। এর বার্তা ছিল—উম্মতে মোহাম্মদীর এক রাতের ইবাদত অন্যের সারাজীবনের (যা হাজার মাস বা তার চেয়েও বেশি হতে পারে) সাধনার চেয়েও ওজনদার।
তথ্য ও উপাত্তের প্রতিফলন: কেন এই রূপক? ইসলামী চিন্তাবিদ ও ভাষাবিদদের মতে, কোরআন এখানে মানুষকে একটি ‘মানসিক রূপান্তর’-এর দিকে নিয়ে যায়: হিসাবি মন বনাম ইবাদতগুজার মন: যদি মানুষ কেবল দিন-মাস-বছরের নিখুঁত হিসেবে লিপ্ত থাকে, তবে ইবাদতের সেই রুহানি বা আধ্যাত্মিক স্বাদটি হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আল্লাহ চান বান্দা যেন এই রাতকে ‘অমূল্য’ হিসেবে গণ্য করে, কেবল ‘৮৩ বছরের সওয়াব’ হিসেবে নয়। অজ্ঞাত রাখার রহস্য: লাইলাতুল কদরকে যেমন রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতে লুকিয়ে রাখা হয়েছে, তেমনি এর পুরস্কারকেও ‘হাজার মাস’ নামক রূপকের আড়ালে অসীম রাখা হয়েছে। যাতে বান্দা সর্বোচ্চ ব্যাকুলতা নিয়ে এটি তালাশ করে।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, সূরা আল-কদরে বর্ণিত ‘হাজার মাস’ মূলত আল্লাহর অসীম রহমত, মাগফিরাত এবং নাজাতের এক মহিমান্বিত রূপক প্রকাশ। একে নির্দিষ্ট বছরের ফ্রেমে না বেঁধে বরং মহান রবের পক্ষ থেকে একটি ‘ওপেন চেক’ বা অবারিত দান হিসেবে গ্রহণ করাই শ্রেয়। সংখ্যার গণ্ডি পেরিয়ে লাইলাতুল কদরের আধ্যাত্মিক গভীরতা অনুধাবন করাই হোক একজন মুমিনের প্রকৃত লক্ষ্য। কারণ মহান আল্লাহর ভাণ্ডার এবং তাঁর প্রতিদান কোনো পার্থিব গাণিতিক সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ নয়; তা চিরন্তন ও অসীম।#
লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক