__ ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: মানুষের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে উপহার বা পুষ্পাঞ্জলি ব্যবহারের রেওয়াজ সুপ্রাচীন। বর্তমান সময়ে অনুষ্ঠানে ফুলের মালা দিয়ে অতিথিদের বরণ করে নেওয়া একটি প্রচলিত রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এই সংস্কৃতির উৎস কী এবং ইসলামের বিধানে এর অবস্থান কোথায়—তা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক আলোচনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে, যে কোনো নতুন রীতির ক্ষেত্রে ‘বিদআত’ বা ধর্মীয় নবপ্রবর্তনের বিষয়টি সামনে আসার ফলে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। যেকোনো রীতির মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তার উৎস, উদ্দেশ্য এবং ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি জানা অত্যন্ত জরুরি।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পুষ্পাঞ্জলি বা মালা ব্যবহারের সংস্কৃতি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের একক উদ্ভাবন নয়। প্রাচীন মিশরীয়, গ্রিক এবং ভারতীয় সভ্যতায় ধর্মীয় আচার, পূজা এবং সম্মান প্রদর্শনে ফুলের ব্যবহার ছিল অপরিহার্য। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সমাজে এটি কেবল সম্মান প্রদর্শনের একটি সামাজিক রীতিতে পরিণত হয়। ইসলামের আগমনের পূর্বে আরবেও বিভিন্নভাবে সম্মান প্রদর্শনের রীতি ছিল, তবে আধুনিক ধারার ‘ফুলের মালা পরিয়ে দেওয়া’ মূলত বিভিন্ন সংস্কৃতির সংমিশ্রণে বিবর্তিত। ধর্মতত্ত্ব ও বিদআতের আলোকে বিশ্লেষণ ইসলামী শরিয়াহর দৃষ্টিতে কোনো কাজকে ‘বিদআত’ বলা হয় তখন, যখন কোনো কাজকে ধর্মীয় ইবাদত বা সওয়াবের কাজ মনে করে নতুনভাবে প্রবর্তন করা হয়, যার পক্ষে কুরআন বা সুন্নাহর কোনো দলিল নেই।
সংবর্ধনার ক্ষেত্রে ফুলের মালার ব্যবহারের বিষয়টি যেভাবে বিদআতের আলোচনার সাথে যুক্ত হয়, তা নিম্নরূপ: ১. এবাদত বনাম আদত (অভ্যাস): আলেমগণ ইবাদত এবং সামাজিক অভ্যাসকে (আদত) আলাদাভাবে দেখেন। ফুলের মালা যদি নিছক সামাজিক সৌজন্য ও ভালোবাসা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং একে কোনো 'ওয়াজিব' বা ‘সওয়াবের কাজ’ মনে করা না হয়, তবে তাকে সরাসরি বিদআত বলা কঠিন।
২. বিদআতের ঝুঁকি: সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন এই রীতিকে সংবর্ধনার অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করা হয়, যেন এটি না করলে সম্মান প্রদর্শন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কোনো সামাজিক প্রথা যখন মানুষের হৃদয়ে ধর্মীয় আচারের মতো স্থান করে নেয়, তখনই তা বিদআতের ঝুঁকির মুখে পড়ে।
৩. বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুকরণ: ইসলামের একটি মূলনীতি হলো, কোনো বিশেষ কাওমের ধর্মীয় প্রতীক বা শিআর (চিহ্ন) অনুকরণ না করা। যদি মালা পরানোর রীতিটি অন্য কোনো ধর্মের ধর্মীয় উপাসনার সাথে সরাসরি যুক্ত হয়, তবে তা পরিহার করাই শ্রেয়। ইসলামের সংস্কৃতি ও মধ্যপন্থা ইসলামে আতিথেয়তার সর্বোচ্চ মর্যাদা রয়েছে।
রাসুল (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে" (সহীহ বুখারী)। তবে এই সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যম হতে হবে মার্জিত এবং শরিয়াহসম্মত। ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠ সম্মান হলো—হাসিমুখে কথা বলা, উত্তম খাবার পরিবেশন করা এবং আন্তরিকতার সাথে অতিথিকে গ্রহণ করা। সংবর্ধনার নামে লোক দেখানো আড়ম্বর বা অতিরিক্ত অপচয় ইসলামের ‘তাকওয়া’ বা সংযমের নীতির পরিপন্থী।
উপসংহার: পরিশেষে বলা যায়, ফুলের মালা দিয়ে সংবর্ধনা জানানো একটি সামাজিক রীতি। ইসলামে এর কোনো সুনির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা নেই, আবার এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ কোনো কাজও নয়—যদি না তাতে ধর্মীয় কোনো আকিদা বা ইবাদতের বিশ্বাস জড়িয়ে থাকে। তবে মুমিনের জীবন হওয়া উচিত অর্থবহ এবং আড়ম্বরমুক্ত। দ্বীনের পবিত্রতা রক্ষা এবং বিদআত থেকে বাঁচতে সামাজিক প্রথা পালনের সময় সতর্ক থাকা জরুরি। সম্মান প্রদর্শনের ক্ষেত্রে লোক দেখানো বা অতিরিক্ত ব্যয়ের চেয়ে পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং ইসলামের শালীনতাকে প্রাধান্য দেওয়াই অধিকতর শ্রেয়। যেকোনো প্রথা পালনের ক্ষেত্রে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত তা যেন ইসলামের আদর্শ ও শৃঙ্খলার সাথে সাংঘর্ষিক না হয়!#
... লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক