___________ড. মোঃ আমিনুল ইসলাম
ভূমিকা: গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা হলো নির্বাচন। আর একটি সার্থক নির্বাচনের মূল মাপকাঠি হলো ভোটারদের নির্ভয় ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মনে একটিই প্রশ্ন—'আমি কি আমার ভোটটি শান্তিতে দিতে পারব?' রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিবর্তন বা ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে ভোটারের উপস্থিতি কেবল সংখ্যাগত গুরুত্ব বহন করে না, বরং তা জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটায়।
একটি দেশে যখন সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিতে পারে, তখন সেই রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তি শক্তিশালী হয়। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ভোটাধিকারের সংগ্রাম বাঙালির ইতিহাসে ভোটাধিকার অর্জনের লড়াই দীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন থেকে শুরু করে ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, যখনই জনগণ সুযোগ পেয়েছে, তারা ব্যালটের মাধ্যমে তাদের দাবি আদায় করে নিয়েছে। বিশেষ করে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনগণের বিপুল ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার অন্যতম নৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভোটাধিকার কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, এটি আমাদের দীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ফসল।
ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ততার গুরুত্ব একটি নির্বাচনে ভোটারদের ব্যাপক অংশগ্রহণ কয়েকটি কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: গণতান্ত্রিক বৈধতা: উচ্চ ভোটার উপস্থিতি নির্বাচিত সরকারের নৈতিক শক্তি বৃদ্ধি করে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়।
জনমতের প্রতিফলন: যত বেশি মানুষ ভোট দেবেন, জাতীয় নীতিনির্ধারণে সাধারণ মানুষের চাওয়া তত বেশি প্রতিফলিত হবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা: অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন রাজনৈতিক সংঘাত হ্রাসে এবং দেশে দীর্ঘমেয়াদী শান্তি বজায় রাখতে সহায়তা করে। তরুণ ভোটার ও ডিজিটাল প্রজন্মের ভূমিকা নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১২ কোটির উপরে। এর মধ্যে একটি বিশাল অংশ তরুণ। এই 'ডিজিটাল জেনারেশন' অনেক বেশি সচেতন এবং তথ্যনির্ভর। তারা কেবল ভোট দিতে চায় না, বরং তারা চায় একটি আধুনিক ও স্বচ্ছ নির্বাচনী প্রক্রিয়া।
তরুণদের কেন্দ্রে আসার প্রধান চালিকাশক্তি হলো তাদের ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। কর্মসংস্থান, সুশাসন এবং প্রযুক্তিবান্ধব রাষ্ট্র গঠনের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা যারা দিতে পারবে, তরুণরা তাদের প্রতিই বেশি আকৃষ্ট হবে। স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ বিগত কয়েকটি নির্বাচনের উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভোটার উপস্থিতির হারে কিছুটা তারতম্য রয়েছে।
ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে কেন্দ্রে আসার পথে প্রধান কিছু বাধা হলো: নিরাপত্তা শঙ্কা: সহিংসতা বা গোলযোগের ভয়ে অনেক সময় সাধারণ ভোটাররা, বিশেষ করে নারী ও বয়োজ্যেষ্ঠরা কেন্দ্রবিমুখ হন।
আস্থার সংকট: নির্বাচন ব্যবস্থা এবং নিরপেক্ষতার ওপর আস্থার অভাব ভোটারদের নিরুৎসাহিত করতে পারে। ভোটাররা যখন মনে করেন 'আমার ভোট দিলেও যা, না দিলেও তা', তখন তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
প্রতিদ্বন্দ্বিতার অভাব: অনেক ক্ষেত্রে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী বা সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে ভোটাররা প্রতিযোগিতার আমেজ খুঁজে পান না। একটি সুন্দর নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ততা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মিলিত দায়িত্ব রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা: কমিশনকে সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতার সঠিক প্রয়োগ করে প্রমাণ করতে হবে যে তারা কোনো বিশেষ পক্ষের নয়। 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড' নিশ্চিত করা তাদের প্রধান কাজ।
নিরাপত্তার নিশ্চয়তা: প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি এবং পথে পথে ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে যাতে কোনো ভয়ভীতি তাদের স্পর্শ না করে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা: গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে তথ্য সংগ্রহের সুযোগ দিতে হবে। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন ভোটারদের মনে সাহসের সঞ্চার করে।
নাগরিক সচেতনতা: ভোট কেনাবেচা বা প্রলোভনের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা এবং ভোট যে একটি পবিত্র আমানত—তা প্রচার করা প্রয়োজন। উপসংহার ভোট দেওয়া কেবল নাগরিক অধিকারই নয়, এটি একটি পবিত্র দায়িত্ব। এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিতে পারবেন কি না, তা নির্ভর করছে নির্বাচন কমিশনের দক্ষতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সহনশীল আচরণের ওপর। যদি একটি ভয়হীন, উৎসবমুখর ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করা যায়, তবে সাধারণ মানুষ অবশ্যই স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে। আর এর মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হবে জনগণের প্রকৃত শাসন। গণতন্ত্র কেবল শব্দে নয়, বরং ব্যালট পেপারের স্বচ্ছতায় সার্থকতা খুঁজে পাক—এটাই ১৬ কোটি মানুষের প্রাণের প্রত্যাশা!#
... লেখক একজন শিক্ষক কবি গবেষক ও প্রাবন্ধিক